News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা সোমবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০২৩, ১৬ মাঘ ১৪২৯

রাজনীতির হালচাল


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট প্রকাশিত: ডিসেম্বর ৩, ২০২২, ১০:১৮ পিএম রাজনীতির হালচাল

চলতি বছর কিছু সময় বিদেশে ছিলেন শামীম ওসমান। তখন চাষাঢ়া বলয়ের অনেক শামীম ভক্ত ছিলেন সুবোধ বালকের মত। ন¤্র ভদ্র ও শান্তশিষ্ঠ। রাজনীতি নিয়ে ওই সময়টুকুতে ওরা মাথা ঘামাতে চাইতো না। কিন্তু শামীম ওসমান ফেরার পর পরই ওদের আচরণ বদলে যায়। নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর বিএনপি নেতারা নিজেদের কর্মসূচী নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন। কোন ধরনের খোঁচাখুঁচিতে যেতে চাইতেন না।

নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর বিএনপি নেতারা কতটা দাপুটে-তার প্রমাণ ইতোমধ্যেই তাঁরা রাজপথে দেখিয়েছেন। বিএনপি নেতাদের দাপুটে মনোভাব দেখে হিংসায় আওয়ামীলীগের অনেক নেতাই জ্বলছেন-পুড়ছেন ! অনেক নেতা সেই জ্বলুনি মনোভাব প্রকাশও করছেন। যতদিন তাদের নেতা শামীম ওসমান দেশে ছিলেন না ততদিন অনেক কষ্টে বিএনপি নেতাদের বিভিন্ন কর্মসূচী ও হুল ফুটানো বক্তব্য না হয় নিরবে সহ্য করেছেন। কিন্তু এখনতো শামীম ওসমান দেশে ফিরেছেন। এখনতো বিএনপি নেতাদের পান খাওয়ার দৃশ্যটাও সহ্য করতে চাইছে না।

তবে বিএনপি নেতারা বলছেন, শামীম ওসমান ছিলনা বলে বিএনপি’র কেন্দ্রীয় নেতারা নারায়ণগঞ্জে এসে বিভিন্ন কর্মসূচীতে যোগ দিয়েছেন, এ কথা ভাবলে সেটা হবে একেবারেই ভুল। আসলে মানুষ জাগতে শুরু করেছে। কথায় আছে পেটে খেলে পিঠে সয়। মানুষতো ঠিকমত খেতেই পারছে না। সবকিছুর দাম নাগালের বাইরে। মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বাড়েনি। কিন্তু সবকিছুর দাম বেড়ে গেছে কয়েক গুণ। এ কারণে মানুষের দুঃখকষ্ট লাঘবের জন্য যে দল রাজপথে নামবে সাধারণ মানুষ সে দলের কথাই শুনবে। আপাতত বিএনপি নেতারা মানুষের দুঃখকষ্টের কথাগুলি বজ্রকন্ঠে উচ্চারণ করছেন। মানুষ পঙ্গপালের মত বিএনপি’র সভা-সমাবেশে জড়ো হচ্ছে। নারায়ণগঞ্জের আওয়ামীলীগ নেতারা বিএনপি’র সফল কর্মসূচীগুলো মেনে নিতে পারছে না।

বিএনপি নেতাকর্মীদের খুঁটির জোর বেড়েছে সাবেক এমপি মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন দলের হাল ধরে প্রকাশ্যে রাজপথে নামার কারণে। সাবেক এমপি মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন  জেলা বিএনপি’র আহবায়ক হবার পর থেকেই তৃণমূলে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে বিএনপি। দলের অভ্যন্তরীণ দ্বিধাবিভক্তি ও হামলা-মামলার পরও প্রতিটি কর্মসূচিতে নেতাকর্মীরা সক্রিয় অংশগ্রহণ করছেন। গত ১৫ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির ৯ সদস্যবিশিষ্ট আহবায়ক কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটিতে আহবায়ক করা হয় মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দীনকে ও সদস্য সচিব করা হয়েছে জেলা যুবদলের আহবায়ক গোলাম ফারুক খোকনকে। এতে যুগ্ম আহবায়ক করা হয়েছে মামুন মাহমুদ, মনিরুল ইসলাম রবি, শহিদুল ইসলাম টিটু, মাসুকুল ইসলাম রাজিব, লুৎফর রহমান খোকা, মোশারফ হোসেন ও জুয়েল আহমেদকে। এই কমিটি ক্ষমতাসীন দলকে সামাল দিতে পারা নিয়ে ছিল যথেষ্ট সন্দেহ। এক মিছিলের মাধ্যমে বাজিমাত সৃষ্টি করে তারা সকল সন্দেহ দূর করে দিয়েছেন এমনটাই মনে করছেন অনেকেই। এদিকে এই বিক্ষোভ মিছিলের মাধ্যমে আগামী জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি আট-ঘাট বেধেই রাজপথে নেমেছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখছে না। বিশাল শো-ডাউনের মাধ্যমে নিজেদের শক্ত অবস্থান জানান দিলো দলটি। বিএনপির পূর্বের যেকোনো সভা-সমাবেশ বিশৃঙ্খলার পূর্ণ থাকলো এবারই প্রথম এমন সুশৃঙ্খল মিছিল করে দেখালো নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপি। অর্থাৎ গিয়াস-খোকনের নেতৃত্বাধীন দলটি বিশাল শোডাউন করার সক্ষমতা দেখিয়ে শতভাগ সফল।

বিশ্লেষকরা বলছেন, গিয়াসের আগমনে রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ যুক্ত হয়েছে। যা মেলাতে হলে কঠিন কৌশলি এবং বুদ্ধির খেলা খেলতে হবে নারায়ণগঞ্জে। অন্যদিকে এতদিন বিএনপি সহজে মাঠে নামতে পারলেও বর্তমানে সেটা কঠিন হয়ে যাবে। কারন, এতদিন বিএনপিকে দুর্বল হিসেবে বিবেচনা করলেও বর্তমানে তাদের বিবেচনা করা হবে শক্ত প্রতিপক্ষ হিসেবে। আর সেই কারনেই সমীকরণ দাঁড়াবে আগের থেকে অনেক বেশী ব্যতিক্রম ও কঠিন। যথারীতি এমপি শামীম ওসমান প্রমাদ গুণতে শুরু করে দিয়েছেন। ইনিয়ে বিনিয়ে তিনি বলতে শুরু করেছেন যে, বিএনপি’তে বিশৃঙ্খলাকারীরা ঢুকে গেছে। কথাবার্তার সুর পরিবর্তন হয়ে গেছে। বিএনপি নেতা নামধারী কিছু লোক আষ্ফালন করছে। ওরা ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতেই বেশি আগ্রহী।

নারায়ণগঞ্জ বিএনপিকে এতদিন আওয়ামী লীগ নেতারা আমলে না নিলেও এবার গিয়াসের আগমনকে নতুন করে দেখছেন তারা। নতুন করে হিসেব কষছেন তাকে নিয়ে। কি হবে গিয়াসের রাজনৈতিক কৌশল? মামলার মাধ্যমেই কি ঠেকিয়ে রাখতে পারবেন নাকি রাজনৈতিক ভাবেই বধ করা যাবে তাকে? স্থানীয় এমপি শামীম ওসমানই বা কিভাবে মোকাবেলা করবেন গিয়াসকে। সব মিলিয়ে গিয়াস উদ্দিন এখন সর্বত্র আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

জানা যায়, সম্প্রতি সাবেক এমপি গিয়াসউদ্দিনকে  জেলা বিএনপি’র আহবায়ক কমিটি গঠনের পর তৃণমূলে সৃষ্টি হয় কিছুটা দ্বিধাবিভক্তি। মান-অভিমানে এখনো কয়েকজন সিনিয়র নেতার  সমর্থক নেতাকর্মীরা দলীয় কর্মসূচিতে নিষ্ক্রিয় থাকছেন। বিএনপি মাঠে নামলেও নারায়ণগঞ্জে তেমন আলোচনা তৈরী করতে পারেনি শুধুমাত্র প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর ঘটনা ছাড়া। কারন পুলিশি বাঁধা বা নিষেধ থাকলেই পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে তারা। একই ভাবে পুলিশের সাথে তর্ক করা তো দূরে থাক উল্টো হাত জোড় করে পালিয়েছেন নেতারা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসবের ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে হতাশ করেছেন বিএনপির নেতাকর্মী সহ সকলে। এমন অবস্থায় একটি শক্ত নেতৃত্ব দরকার ছিলো দলের ভেতর।

জনমানুষের দাবি নিয়ে মাঠে থাকায় দলটির কর্মসূচিতে ভালো জমায়েত হচ্ছে। আর এই জনসমর্থন থেকে সরকার পতনের স্বপ্ন দেখছেন দলটির নেতারা। আওয়ামীলীগের প্রতি বিরক্ত লোকজন এখন সমর্থন করছে বিএনপি’কে। এই জনসমর্থন থেকেই মানসিকভাবে উজ্জীবিত হয়ে বিএনপি নেতাকর্মীরা রাজপথে টিকে থাকার শক্তি অর্জন করছে। জনসমর্থনের শক্তিমত্তার জোরেই বিএনপি গর্জন ও করছে মাঝে মধ্যে। জনসমর্থনকে বিএনপি নেতৃবৃন্দ সরকারের পতন পর্যন্ত নিয়ে যেতে প্রস্তুত।

নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির কয়েকজন সিনিয়র নেতা বলেন, আমরা জনগণের দাবি আদায়ে মাঠে নেমেছি। জনগণের যে মৌলিক অধিকার সেটার কথা বলছি। সবকিছুর মূল্য বেড়ে গেছে। তেলের মূল্য, পানির মূল্য, যাতায়াত খরচসহ সব ধরনের ব্যয় বেড়েছে। মানুষ অস্বস্তিকর অবস্থায় আছে। তাদের অধিকার রক্ষায় আমরা মাঠে নেমেছি। আমাদের কর্মসূচিতে প্রচুর মানুষের সমাগম হচ্ছে। সরকারের বিরুদ্ধে তারা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে।

নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতির প্রতিবাদে জনগণের দাবি নিয়েই মাঠে নেমেছে বিএনপি। বিগত দিনে জনগণের এমন দাবি নিয়ে দলটি বড় ধরনের জমায়েত করতে পারেনি। এবার সাধারণ মানুষের দাবি নিয়ে মাঠে নামাতে দলটির কর্মসূচিতে জনসমাগম দেখা যাচ্ছে। তাছাড়া এবার কর্মসূচিতে বিএনপি কিছু কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে। সংশ্লিষ্ট জেলার সাবেক সংসদ সদস্য ও অতীতে দলের মনোনয়ন পাওয়া নেতাদের কর্মসূচিতে উপস্থিত থাকতে কেন্দ্র থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দলের কেন্দ্রীয় নেতাদেরও নিজ নিজ জেলার কর্মসূচিতে অংশ নেয়ার নির্দেশনা আছে। আবার জেলা পর্যায়ের কর্মসূচি বাস্তবায়নে সমন্বয় এবং কর্মসূচি কতটা সফলভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে, তা পর্যবেক্ষণের জন্য সব বিভাগে কেন্দ্রীয় নেতাদের নেতৃত্বে আলাদা টিমও গঠন করা হয়েছে। সবকিছু মিলে এবার গোছানো কর্মসূচি হওয়াতে দীর্ঘ হচ্ছে জমায়েতের সারি।

দেওভোগের কয়েকজন  জেলা বিএনপি’র নেতা বলেন, সরকারের স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাব, দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, নানান ট্যাক্স বৃদ্ধি, পানির দাম বৃদ্ধি, প্রতিটি ক্ষেত্রে নিপীড়ন-অত্যাচার চালানোর কারণে মানুষ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। আমাদের লাগাতার কর্মসূচি থানা-ওয়ার্ড অনুযায়ী সাজানো আছে। প্রত্যেকটি কর্মসূচিতে আগের তুলনায় মানুষের উপস্থিতি কয়েকগুণ বেড়েছে। নিবিঘেœ মানুষ কর্মসূচিতে আসছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৯১ সাল ও ২০০১ সালে নির্বাচিত হয়ে পাঁচ বছর করে ১০ বছর ক্ষমতায় থাকলেও একটানা গত দেড় দশক ক্ষমতার বাইরে বিএনপি। আর এই সময়ে ক্ষমতায় তাদের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগ। এই সময়ে নানাভাবে আন্দোলন করেও প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগকে ঘায়েল করতে পারেনি বিএনপি। ২০১৪ সালে নির্বাচন বর্জন করে সরকার পতনের ডাক দিয়েছিল বিএনপি; তবে তারা সফল হয়নি। এরপর ২০১৮ সালে ভোটে গিয়েও আওয়ামী লীগকে হারাতে পারেনি। এরমধ্যে দুর্নীতির মামলায় দন্ড নিয়ে দলের প্রধান খালেদা জিয়াকে কারাগারে যেতে দেখেছেন জিয়াউর রহমানের গড়া এই দলটির নেতা-কর্মীরা। তাকে মুক্ত করতে আন্দোলনও নিস্ফল ছিল। ফলে বিএনপির আন্দোলনের সামর্থ্য নিয়ে খোঁচা দিয়ে আসছেন আওয়ামী লীগ নেতারা। বিপরীতে বিএনপি শক্ত কোনো অবস্থান দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে। তবে এবারের কর্মসূচিতে সেই খোঁচা কিছুটা হলেও ঘুচবে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।

মহানগর বিএনপি’র কয়েকজন নেতা বলেন, কর্মসূচিতে দলীয় নেতাকর্মী ছাড়াও সাধারণ মানুষের উপস্থিতি অনেক বেড়েছে। প্রথম দিকে তেমন একটা বাধা না থাকলেও ব্যাপক মানুষের উপস্থিতি দেখে এখন বাধা আসতে শুরু করেছে। চাষাড়া, কালিরবাজার মোড়, ২নং রেলগেইটসহ বিভিন্ন পয়েন্টে বাধার মুখে হরতাল কর্মসূচি পালন করেছে বিএনপি ও বামদলগুলো। সেখানেও প্রচুর মানুষের জমায়েত হয়েছে। দাবি আদায়ে মানুষ কর্মসূচিতে যোগ দিচ্ছে।

জেলা বিএনপির আরেক নেতা বলেন, বিএনপির সাথে মানুষ সব সময় আছে। সরকারের উপর মানুষ ক্ষুব্ধ। মানুষ শুধু সরকারকে উৎখাত করতে পারছে না। আমাদের কর্মসূচিতে মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়েছে। বাধা প্রতিনিয়ত আছে, বাধা দেখা যাচ্ছে না। নানাভাবে বাধা দিচ্ছে, সেই বাধা প্রতিহত করে মানুষ কর্মসূচিতে আসছে। জনস্রোত যখন সৃষ্টি হয় সেখানে কোনো বাধা টিকতে পারে না।

রাজনৈতিক অঙ্গনের বিশ্লেষকরা বলছেন, নারায়ণগঞ্জের কিছু আওয়ামীলীগ নেতা বিএনপিকে সইতে পারছে না। বিশেষ করে চাষাড়া ব্লকের নেতাদের মধ্যে বিএনপি বিদ্বেষী মনোভাবটা বেশি লক্ষ্য করা যায়। আসলে ওরা ভীতু। ওরা ভয়ে মরছে। শৈশবের আদর্শলিপি বইয়ে পাঠ করা সেই কবিতার মতই। ‘ঈগল পাখি আসছে তেড়ে ইঁদুর ছানা ভয়ে মরে’। শামীম ওসমান অনুসারীরা এতদিন ছিলেন চুপচাপ। কারণ তাদের নেতা দেশের বাইরে ছিলেন। এখন দেশে ফিরেছেন। তাই নেতাকে সাহস দেখাচ্ছেন। এমনও হতে পারে সবই ভড়ং! কারণ নারায়ণগঞ্জ আওয়ামীলীগে বিভক্তির রাজনীতি চলমান। চাষাঢ়া ব্লকের নেতারা দেওভোগ ব্লকের নেতাদের দেখতে পারে না। অন্তত দেওভোগ ব্লকের নেতাদের সাথে কোন লিয়াঁজো করে না। শামীম ওসমান নিজেই অভিযোগ করে বলে থাকেন যে,  দেওভোগের নেতারা সব সময় আত্মীয়তা বা পাড়া-পড়শি’র অজুহাত দেখিয়ে বরাবরই বিএনপি-জামায়াত নেতাদের সাথে লিয়াঁজো রাখেন। যদিও দেওভোগ ব্লকের নেতারা এই অভিযোগ কোন দিনই মেনে নেননি। বরং প্রতিবাদ করে এসেছেন।

Islams Group
Islam's Group