News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা মঙ্গলবার, ০৬ ডিসেম্বর, ২০২২, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

জন্ম বিএনপিতে অপরাধ আওয়ামী লীগে


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট প্রকাশিত: নভেম্বর ২১, ২০২২, ১১:১৬ পিএম জন্ম বিএনপিতে অপরাধ আওয়ামী লীগে

নারায়ণগঞ্জে গত এক দশকে যেসব ব্যক্তির কারণে আওয়ামী লীগের এ জন্মজেলা বিতর্কিত হয়েছে তাদের গোড়া ছিল বিএনপির। এক সময়ে বিএনপির ডাকসাইটে নেতারা ভোল পাল্টে ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতাদের আশ্রয় প্রশ্রয়ে বেড়ে উঠে এ নানা অপরাধের জন্ম দেয়। হত্যা, মাদক ব্যবসার পাশাপাশি নানা অপরাধে জড়িয়ে নিজেদের শেষ গন্তব্য যেমন হয়ে উঠে কারাগার তেমনি তাদের কারণে সমালোচনার মুখে পড়েন আশ্রয়দাতারা। শুরুতে এসব আশ্রয়দাতার সব ধরনের শেল্টার দিলেও বিপদে পড়লে মুখ সরিয়ে নিতে শুরু করে। সবশেষ বুয়েটের মেধাবী ছাত্র ফারদিন হত্যার পর রূপগঞ্জের আলোচিত চনপাড়া বস্তি যেমন আলোচনায় আসে তেমনি মুখ্য ছিল এ বস্তির নিয়ন্ত্রক গডফাদার ইউপি সদস্য বজলুর রহমান। বছরের পর বছর ক্ষমতাসীনদের উপর ভর করে একচ্ছত্র মাদক বিক্রি ছিল তার নেশা। এর আগে আলোচনা ছিলেন সাত খুন মামলার ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত আসামী নূর হোসেন। অথচ এ দুইজনের গোড়া ছিল বিএনপির।

স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন, আওয়ামী লীগের রাজনীতির সূতিকাগার বলা হয়ে থাকে নারায়ণগঞ্জকে। বলা হয়ে থাকে এই নারায়ণগঞ্জ থেকেই আওয়ামী লীগ গঠন প্রক্রিয়া কার্যক্রমের সূচনা ঘটেছিল। সেই সাথে শুরু থেকেই নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে ভূমিকা পালন করে আসছে। কিন্তু বর্তমানে নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে নানা সমীকরণে চলে আসছে। আর এই সমীকরণে নিজেদের হিসেব ঠিক রাখতে গিয়ে কখনও কখনও প্রভাবশালী নেতারা আওয়ামী দলীয় প্রতিক নৌকা ভাসিয়ে থাকেন আবার কখনও কখনও এই প্রভাবশালী নেতারাই নৌকা প্রতিককে ডুবিয়ে থাকেন। বিশেষ করে গত ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনের সময়ে এটাই পরিলক্ষিত হয়েছে।

আলোচিত একটি নাম বজলুর রহমান। তিনি রূপগঞ্জের কায়েতপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ৯ নম্বর ওয়ার্ডের (চনপাড়া এলাকা) মেম্বার। ৯৬ সালে আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় আসার পর স্থানীয় নির্বাচনে বস্তির বাসিন্দাদের ভোটাধিকার না থাকলেও সংসদ নির্বাচনে ভোট দেয়ার সুযোগ হয়। তখন রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন চনপাড়ার মানুষ। সেসময় চনপাড়ার ছিচকে চোর আর বাসের হেলপার হিসেবে পরিচিত বজলু চনপাড়া আওয়ামী লীগ নেতা আবু তাহেরের চা এনে দেবার কাজ করতেন। এর আগে বজলুর বিএনপির রাজনীতি করতো। সে সময় রূপগঞ্জ এলাকার আওয়ামী লীগের এক নেতা তাঁকে কাছে টানতে টাকা-পয়সা দিয়ে সহযোগিতা করেন। কারণ চনপাড়া বস্তির নিয়ন্ত্রক তখনও তিনি। পরে সেই নেতার হাত ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত হন। এখন প্রভাবশালী রাজনৈতিক অনেক নেতারই আশীর্বাদপুষ্ট। ২০০৩ সালে রূপগঞ্জের সাবেক এমপি জেনারেল শফিউল্লাহর বিরুদ্ধে অনাস্থা এনে ঝাড়ু জুতা মিছিল করে আলোচনায় আসে বজলু। এক পর্যায়ে সেখানকার আওয়ামী লীগের সম্পাদকের পদ বাগিয়ে নেন। ২০০৬ সালে সামরিক শাসন আমলে বস্তি থেকে ভাড়াটে লোক এনে রূপগঞ্জ ও রাজধানীতে মিটিং-মিছিল-পিকেটিং আর নৈরাজ্য কর্মকান্ডের কারণে কদর বেড়ে যায় এই অপরাধীর। সেসময় ১১টি মামলা নিয়ে সেনাবাহিনীর হাতে আটক হয় বজলু। পরবর্তীতে ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর আর পেছনে তাকাতে হয়নি তাকে। ২০১৬ সালে এমপি গাজীর আশীর্বাদে বজলু প্রথমবারের মতো ইউপি সদস্য নির্বাচিত হন। পরে ২০২২ সালের ইউপি নির্বাচনে দ্বিতীয়বার তাকে একই উপঢৌকন দেন এমপি। ২৩ বছর পর গঠন হওয়া উপজেলা আওয়ামীলীগের ঘরোয়া কমিটিতেও তাকে করা হয় সদস্য।

আলোচিত সাত খুনের প্রধান আসামি নূর হোসেনের কর্মজীবন ট্রাকের হেলপার দিয়ে শুরু। সিদ্ধিরগঞ্জের অপরাধের নিয়ন্ত্রক ছিল নূর হোসেন। নূর হোসেন ১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থীর পক্ষে কাজ করে হয়ে যান বিএনপি নেতা। ১৯৯২ সালে সিদ্ধিরগঞ্জ ইউপির চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হয় নূর হোসেনসহ ১৩ জন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি প্রার্থী হিসেবে পরবর্তী ইউপি নির্বাচনেও চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয় নূর হোসেন। তখন আওয়ামী লীগ থেকে শামীম ওসমান প্রার্থী দেন নিহত নজরুল ইসলামকে। চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর নূর হোসেনকে টেনে নেয় তৎকালীন এমপি শামীম ওসমান। গিয়াসউদ্দিনের সঙ্গে পল্টি দিয়ে নূর হোসেন যোগ দেন শামীম ওসমানের দলে। পরে বনে যান আওয়ামী লীগ নেতা। কিন্ত শামীম ওসমানের হাত ধরে লাইম লাইটে আসেন নূর হোসেন। ধীরে ধীরে আওয়ামী লীগের উচ্চপর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তোলেন। তখন শামীম ওসমানকে এড়িয়ে চলতেন নূর হোসেন। ১৯৯২ সালে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে নুর হোসেন গড়ে তুলে সন্ত্রাসী বাহিনী। তাদের মাধ্যমে পরিবহনে চাঁদাবাজি, জায়গা-জমি দখল, শিল্পকারখানায় চাঁদাবাজি, শীতলক্ষ্যা নদীর তীর দখল করে পাথর বালুর ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে নেন নূর হোসেন।

কাশিপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের ত্রি-বার্ষিক সম্মেলনে অনুষ্ঠিত প্রতিদ্বন্দ্বি ছাড়াই সভাপতি নির্বাচিন হন আইয়ুব আলী। অথচ এ আইয়ুব আলী এক সময়ে আওয়ামী লীগ বিদ্বেষী ছিলেন। করতেন বিএনপির রাজনীতি। নারায়ণগঞ্জের ২০০ বছরের কলংক পতিতা পল্লীর এক সময়ের সর্দার ছিলেন আইয়ুব আলী। সেসময় তিনি পতিতা পল্লী থেকে মোটা অংকের টাকা পেয়ে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে যান। এরপর ১৯৯৬সালে আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় আসে। তখনকার সময় নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য শামীম ওসমান সেই সরকারের শেষ সময়ে পতীতা পল্লী উচ্ছেদের উদ্যোগ নেন। এমপি শামীম ওসমানের উদ্যোগকে সুশীল সমাজ সাধুবাদ জানালেও পতীতা পল্লীর সর্দাররা বিরোধীতা করছিল। তারা এমপির বিরুদ্ধে নানা রকম স্লোগানে স্লোগানে শহরকে উত্তপ্ত করে তুলেছিল। এমপি শামীম ওসমানের বিরুদ্ধে পতিতা পল্লীর সর্দার আইয়ুব আলী ছিল মূখ্য ভূমিকায়। পতীতা পল্লীর সামনে এমপি শামীম ওসমানের কুশপুত্তলিকাদাহও করেছিলেন দালালরা।

ফতুল্লা থানা যুবলীগের সভাপতি মীর সোহেল আলী অঘোষিত নিয়ন্ত্রক। দীর্ঘদিন বিএনপির রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত থেকে আওয়ামীলীগে যোগদান করে মাঠ পর্যায়ে নিজের অবস্থান তৈরি করে বিভিন্ন সেক্টর নিয়ন্ত্রন করছেন। মীর সোহেল দীর্ঘদিন ফতুল্লায় বিএনপির রাজনীতি সম্পৃক্ত হয়ে থানা ছাত্রদলের সভাপতি হয়। দীর্ঘদিন এ পদে আসিন থেকে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে। একপর্যায়ে চতুর চালাক মীর সোহেল আওয়ামীলীগ প্রথম ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামীলীগে যোগদান করে। ওই সময়ে ফতুল্লায় আওয়ামীলীগের তেমন একটি জনপ্রিয়তা ছিল না যেমনটা এখন রয়েছে। যার কারণে দলের শীর্ষ নেতাদের ম্যানেজ করার চেষ্টা করে। এক পর্যায়ে তিনি ফতুল্লা থানা যুবলীগের সভাপতি হয়। আর সেই সুবাধে আওয়ামীলীগের প্রভাবশালী এমপি শামীম ওসমানের আস্থা অর্জন করে। শামীম ওসমানের সাথে থেকে রাজনীতি করে সুবিধা গ্রহণ করে আবার পল্টি দেয়। ২০০৮ সালে জাতীয় নির্বাচনে সারাহ বেগম কবরী আওয়ামীলীগের এমপি হওয়ার পর সুবিধা নিতে এবং সেক্টর দখল করতে তার বাবা মীর মোজাম্মেল আলী তাকে কবরী কাছে নিয়ে তার সাথে যোগদান করেন।

মনিরুল আলম সেন্টু নৌকা প্রতীক নিয়ে বিনা ভোটে কুতুবপুরের চেয়ারম্যান ছিলেন। সেন্টু এক সময়ের বিএনপির ডাকসাইটে নেতা ছিলেন। ফতুল্লা এলাকাতে বিএনপির ভাষায় অনেক আন্দোলন সংগ্রাম আর আওয়ামী লীগের ভাষা যেটা ‘নাশকতা’ তার নেতৃত্বে ছিলেন সেন্টু। ২০১৪ সালের জানুয়ারীতে ফতুল্লায় ও ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডে বাসে আগুন দিয়ে মানুষ হত্যার চেষ্টা সহ নানা ধরনের অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। নাশকতা ও বাসে আগুন দেওয়ার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে ফতুল্লা থানায় ডজনখানেক মামলাও আছে।

এ ব্যাপারে জেলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি ও পরিচ্ছন্ন আওয়ামী নেতা সানাউল্লাহ সানু বলেন, বিএনপি থেকে আসারাই হয়ে যাবে মূল কান্ড। এর পরিণতি ভালো হবে না। সিদ্ধিরগঞ্জের নজরুল ছিল জেলা ছাত্রলীগের সেক্রেটারী। আওয়ামী লীগে জয়েন করলো নূর হোসেন। এরপর কি হলো? নূর হোসেনের হাতে আমরা নজরুলকে হারালাম সাথে আরও ৬ জন। এই প্রভাবশালী পরিবার নূর হোসেনকে আওয়ামী লীগে জয়েন করানোর কারণেই আমরা ৭ জনকে হারিয়েছি। এখন কুতুবপুরে সেই ধারবাহিকতা শুরু হয়েছে। যারা এতদিন কুতুবপুরে আওয়ামী লীগের জাঁদরেল নেতা ছিলো তাদের সরিয়ে নতুন নেতা তার অবস্থান নিবে।

তিনি দলের ভেতর দুর্নামের বিষয়ে বলেন, আমি যখন থানার সেক্রেটারি তখন সোহেল (মীর সোহেল) জয়েন করে আমাদের দলে। সোহেল ছিল জেলার সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক। এগুলো তাদের আধিপত্য বিস্তার করার জন্য করছে। সেন্টু এখন আসছে সেও একই কাজ শুরু করবে। যত আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতা আছে যেমন পলাশ, নাজিম উদ্দিন, গোলাম রসুল এগুলারে দাবায়া একদিন সে এক নাম্বারে আসবে। আর শামীম  ওসমান যেদিন থাকবো না সেন্টুই এমপি পদে নমিনেশন চাইবো।

Islams Group
Islam's Group