News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২২, ১৪ আশ্বিন ১৪২৯

যেসব বিদ্রোহে উত্থান


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২২, ২০২২, ১০:১৪ পিএম যেসব বিদ্রোহে উত্থান

নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির আহবায়ক হয়েছেন সাখাওয়াত হোসেন খান যার উত্থান মূলত রাজনীতিতে বিদ্রোহ করেই। মহানগর বিএনপি ও বিলুপ্ত শহর কমিটির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে পাল্টা কর্মসূচীও করেছিলেন তিনি। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বিরুদ্ধে মামলা করেও ছিলেন আলোচনায়।

জানা যায়, জেলা আইনজীবী সমিতির মাধ্যমেই অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন বিএনপির রাজনীতি শুরু। তিনি বিএনপির সমর্থনে ও সমর্থন ছাড়াও কয়েকবার নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক সহ বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। সেই সুবাধে তিনি বিএনপির রাজনীতিবিদ হিসেবেই নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিচিত হতে থাকেন। ২০১৩ সালের এপ্রিলে সারাদেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টিকারী সাত খুনের ঘটনায় আসামীদের বিপক্ষে আইনজীবী হয়ে আলোচনায় আসেন তিনি। প্রায় প্রতিনিয়তই বিভিন্ন গণমাধ্যমে বক্তব্য দেয়ায় আলোচিত মুখ হয়ে যান তিনি।

এর পরপরই ২০১৬ সালে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন ঘনিয়ে আসে। ওই নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ বিএনপির কোন নেতা অংশগ্রহণ করতে ইচ্ছুক না থাকায় সহজেই বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী হয়ে যান অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান। নিজের পক্ষে কোন জনসমর্থন না থাকা সত্ত্বেও বিনা বিরোধীতায় প্রার্থী হয়ে যান। ফলে নির্বাচন শেষে আওয়ামীলীগের সমর্থিত প্রার্থীর সাথে তার বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজয় ঘটে। যদিও তার দাবি নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে। কিন্তু তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে কোথাও কোন অভিযোগ করিনি।

দলীয় সূত্রমতে, ২০১৬ সালের নাসিক নির্বাচনে সাখাওয়াত মনোনয়ন পাবার আগ থেকেই তার পাশে ছিলেন টিপু। নিজে পাশে থেকে পুরো নির্বাচনে সহযোগিতা করেন টিপু। তার নিয়ন্ত্রণে ছিল নির্বাচনের সকল কিছু। নির্বাচনের পরেও দুজনের সম্পর্ক ছিল বেশ ভালো। তবে বাদ সাধে হঠাৎ ২ কোটির একটি অভিযোগ! হুট করেই নির্বাচনে বিভিন্ন স্থান থেকে এবং ক্ষমতাসীনদের কাছ থেকে সাখাওয়াত অর্থ নিয়েছেন বলে অভিযোগ তোলেন টিপু। সেই অভিযোগ উঠার পর বিভিন্ন গণমাধ্যম ও টকশোতে নিজের কথা পক্ষে নানা যুক্তি উপস্থাপন করে সাখাওয়াতকে এ বিষয়ে প্রমাণ দিতে বলেন তিনি। এ থেকে তৈরী হয় দূরত্ব। সেই দূরত্ব থেকে টিপু সাখাওয়াতকে মহানগর বিএনপির সর্বশেষ কমিটির নানা কর্মসূচীতে দূরে রাখতেন। শেষ কমিটির সভাপতি সাবেক সংসদ সদস্য আবুল কালামকে নিজের আয়ত্তে নিয়ে সেখান থেকে সাখাওয়াতকে মাইনাস করেন টিপু। দলের কর্মসূচীতে অনেক সময় সাখাওয়াতকে জানাতেন না টিপু এমন অভিযোগ করেছেন সাখাওয়াত। তবে দলের কেন্দ্রের চাপে সর্বশেষ কর্মসূচীগুলো একসাথে পালন করতে হয়েছে তাদের।

এরপর ২০১৭ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারী মহানগর বিএনপির আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়। আর এতে বিএনপির অনেক সিনিয়র নেতাকে ডিঙ্গিয়ে অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান সহজেই মহানগর বিএনপির সহ সভাপতি হয়ে যান। এর আগে ২০০৯ সালে শহর বিএনপির মূলধারার কমিটিতে ঠাই না পেয়ে বিদ্রোহী কমিটি গঠন করেছিলেন সাখাওয়াত। যেখানে নুরুল ইসলাম সর্দারকে সভাপতি ও সাখাওয়াত হোসেন খান নিজে সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন।

বিএনপির পুনর্গঠন করার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে গত ১৮ মার্চ রাজধানীর পল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠক শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি মহানগর বিএনপির বাদানুবাদের কারণে। যেখানে অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান সভাপতি অ্যাডভোকেট আবুল কালামের সাথে তর্ক বিতর্কে লিপ্ত হন। আবুল কালাম বলেন, মহানগর বিএনপির কমিটি হওয়ার পর ৫ মাস আমাদের মধ্যে কোন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়নি। যখনই সাখাওয়াত হোসেন আলাদা হয়ে যান তখনই মহানগর বিএনপিতে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। দলের মনোনয়ন যে কেউ চাইতেই পারে। তবে এজন্য আলাদাভাবে কর্মসূচি পালন করতে হবে, সেটা তো কোন নিয়ম হতে পারে না।

সাখাওয়াতের বিরুদ্ধে এক সময়ে নানা অভিযোগ থাকলেও সাত খুনের পর মিইয়ে যায় আগের সব কালিমা। তাছাড়া সাত খুনের পর থেকে কৌশলও পরিবর্তন ঘটান তিনি। বিএনপির অনেক নেতাকর্মী যারা বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন তাদেরকে বিনা পয়সায় আইনী সহায়তা দিয়েও আলোচনায় আসেন। তবে এর মধ্যে ২০১৩-২০১৪ ও ২০১৪-২০১৫ বছরে নারায়ণগঞ্জ আইনজীবী সমিতিতে সভাপতি নির্বাচিত হন। এছাড়া এক সময়ে তিনি জেলা বিএনপির সভাপতি তৈমূর আলম খন্দকারের ‘জুনিয়র’ থাকলেও ২০১৩ সালের পর থেকে তাদের সম্পর্কের মধ্যেও অবনতি ঘটে। সাখাওয়াতের বাড়ি মুন্সীগঞ্জ জেলাতে। ১৯৮৪ সালে তিনি মুন্সীগঞ্জ জেলা যুবদলের সহ সভাপতি ছিলেন। ৯০ দশকে নারায়ণগঞ্জ আসার পর আইন কলেজে ভর্তি হন এবং আইন পেশায় জড়ান। তখন থেকেই বিএনপির রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন।

২০০৯ সালের ২৮ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জ শহর বিএনপির সম্মেলন হয়। সেদিন শহরের ৯টি ওয়ার্ডের প্রতি ওয়ার্ড থেকে ৫১ জন করে ৪৫৯ জন কাউন্সিলরদের ভোটে জাহাঙ্গীর আলম সভাপতি, এটিএম কামাল সেক্রেটারী নির্বাচিত হন। তবে ওই কমিটি গঠনের আগেই নারায়ণগঞ্জে বিএনপির একটি গ্রুপ বিদ্রোহ করে পাল্টা কমিটি গঠন করে। ওই কমিটিতে সভাপতি করা হয় নুরুল ইসলাম সরদারকে যিনি ২০০৩ সালে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভা নির্বাচনে সেলিনা হায়াৎ আইভীর সঙ্গে নির্বাচন করে পরাজিত হন। আর সেক্রেটারী হন সাখাওয়াত হোসেন খান। ২০০৯ সালের ২৫ নভেম্বর শহরের আলী আহাম্মদ চুনকা পাঠাগার মিলনায়তনে জেলা বিএনপির দ্বি বার্ষিক সম্মেলন হয়। তবে ওই সম্মেলনের আগের দিন নারায়ণগঞ্জ পৌর বিএনপির প্যাডে বিদ্রোহী গ্রুপের সভাপতি দাবিদার নুরুল ইসলাম সরদার এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জেলা বিএনপির সম্মেলন প্রতিহত করে সেখানে প্রতিবাদ সভার ডাক দেওয়া হয়। জেলা বিএনপির সম্মেলনের আগে সম্মেলন স্থগিতাদেশ চেয়ে আদালতে একটি রিট করা হয়। বিএনপি নেতা আবু আল ইউসুফ খান টিপুর স্থগিতাদেশ চেয়ে নারায়ণগঞ্জ চতুর্থ সিনিয়র সহকারী জজ বেগম মেহেরুন্নেছার’র আদালতে ২৪ নভেম্বর একটি দেওয়ানী মামলার আবেদন করেন। একই আবেদনে মামলাটি নিস্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সম্মেলনের ওপর স্থগিতাদেশ তথা নিষেধাজ্ঞা প্রদানের আর্জি করা হয়। তবে আদালত সেটা আমলে নেয়নি। ওই আবেদনের আইনজীবী ছিলেন সাখাওয়াত হোসেন খান। শুনানী চলাকালে উভয় পক্ষের আইনজীবিদের মধ্যে ব্যাপক বাদানুবাদ ঘটে। ২৫ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জের সম্মেলনে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ উপস্থিত ছিলেন। তবে ওই সভা বন্ধের সকল চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে বিএনপির বিদ্রোহী গ্রুপের নেতারা হামলা করলে ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সাখাওয়াত হোসেন খানের বিরুদ্ধে যখন বিদ্রোহের তকমা তখন ২০১৩-২০১৪ বছরে নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতি নির্বাচনে বিএনপির বিদ্রোহী করে সভাপতি নির্বাচিত হন। চলে আসেন আলোচনায়। পরের বছর ২০১৪-২০১৫ বছরেও সভাপতি হন।

সবশেষ নিজ দলের আইনজীবী এমনকি এসময়ে নিজের জুনিয়র অ্যাডভোকেট শহীদ সারোয়ারে হামলার শিকার হরে গুরুতর আহত হয়েছেন। তাকে মারধর করে রক্তাক্ত করা হয়েছে। মারধর করে তাকে গাড়িতে করে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা চালানো হয়। পূর্ব শত্রুতার জের ধরে ২৮ এপ্রিল দুপুরে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের নিকটবর্তী চেম্বার থেকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়ার এই প্রচেষ্টা চালানো হয়।

এর আগে জেলা আইনজীবী ফোরামের কমিটি গঠন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ২০১৯ সালের ৩১ অক্টোবর বিকেলে নারায়ণগঞ্জ আদালতপাড়ায় জেলা জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সদস্য ফরম বিতরণের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে শেষে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের যুগ্ম আহবায়ক ব্যরিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানের হাতে ৪’শ ফরম তুলে দেন। একই সাথে তিনি বলেন, সদস্য পদ ফরম বিতরণ ও সংগ্রহের যারা দায়িত্বে আছেন তারা সবাই মিলে এসব সদস্য পদ পূরণ করাবেন। কিন্তু ওই দিন অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান অন্যদেরকে সদস্য ফরমগুলো না দিয়ে নিজের কাছেই রেখে দেন। সবশেষ সদস্যপদ নিজের কাছে রাখার ব্যাপারে তালবাহানা শুরু করলে অন্য আইনজীবীরা ক্ষেপে গিয়ে অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হেসেন খানকে লাঞ্ছিত করেন। অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানকে চড় থাপ্পর দেয়া হয়েছিল বলে প্রচার হয়েছিল আদালতপাড়ায়।

এর আগে অনেকদিন আগে নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপুু সহ বিএনপির নেতাকর্মীদের দ্বারা মারধরের শিকার হয়ে গুরুতর আহত হয়েছিলেন অ্যাডাভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান।

ওই বছরের ৪ নভেম্বর সাখাওয়াত হোসেন খানের সাথে নিজ দলেরই আইনজীবী আব্দুল হামিদ খান ভাষানী ও আব্দুল বারী ভূঁইয়ার হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। সেদিন সকাল সাড়ে ১০টায় আদালত প্রাঙ্গনে সাখাওয়াত হোসেন খানসহ আরও জুনিয়র কিছু আইনজীবী আব্দুল বারী ভূঁইয়ার উপর চড়াও হন। পরবর্তীতে সাখাওয়াত হোসেন খান নিজে আব্দুল হামিদ খান ভাষানীর চেম্বারের সামনে গিয়ে আব্দুল হামিদ খানকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করলে ভাষানীও পাল্টা গালিগালাজ করেন। এ সময় তাদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে।

এর আগে নারায়ণগঞ্জের একটি আদালতে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ জেলা ও মহানগর বিএনপির সভাপতি সম্পাদকের বিরুদ্ধে মামলার আবেদন দায়ের করেছেন বিএনপির দুইজন নেতা। নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে সীমানা ও গঠনতন্ত্র মানা হয়নি উল্লেখ করে ওই মামলার আবেদন করা হয়।

মামলায় বিবাদী করা হয়েছে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জেলা বিএনপির সভাপতি কাজী মনিরুজ্জামান, সাধারণ সম্পাদক মামুন মাহমুদ, মহানগর বিএনপির সভাপতি আবুল কালাম ও সাধারণ সম্পাদক এটিএম কামালকে। মহানগরের ১০ নং ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সভাপতি গোলজার খান ও একই ওয়ার্ডের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক (পৌরসভাকালীন) বিএনপি নেতা নূর আলম শিকদার বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। এ দুইজনই মহানগর বিএনপির সহ সভাপতি অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানের অনুগামী হিসেবে পরিচিত। তার বিভিন্ন সভা সমাবেশে ও মিছিল মিটিংয়ে এই দুই নেতার দেখা মিলে।

মামলার নিয়োগকৃত আইনজীবী অ্যাডভোকেট আবু বক্কর সিদ্দিক নারায়ণগঞ্জ আদালতপাড়ায় বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের সাথে কথা বলতে গিয়ে অকপটেই স্বীকার কেেরন অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানের অনুুরোধেই তিনি মামলার ফাইল করেছেন।

প্রথমে বিষয়টি নিয়ে সরাসরি কারও নাম উল্লেখ করতে না চাইলেও পরে অ্যাডভোকেট আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, আমাকে অনুরোধ করে বলা হয়েছে, আপনি কাজটি করলে কমিটি ঠিক হয়ে যাবে। এটা দলের জন্য ভাল হবে। দলের জন্য কোন ক্ষতি হবে না। সেই সাথে আমি একজন আইনজীবী। পেশা হিসেবে আমি কাজ করতেই পারি। অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানের অনুরোধেই বাদীপক্ষের আইনজীবী হিসেবে কাজ করতে রাজী হয়েছিলাম।

Islams Group
Islam's Group