News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২২, ১৪ আশ্বিন ১৪২৯

মহানগরে বিএনপির তৃতীয় শক্তির উত্থান


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২২, ১১:১২ পিএম মহানগরে বিএনপির তৃতীয় শক্তির উত্থান

একটি বলয়ের রাজনীতি তিন দশকের বেশী সময় ধরে। অপর বলয়ের রাজনীতি দুই যুগের বেশী। মাঝখানে অনেক উত্থান পতন দেখা দিলেও ঘুরে ফিরে এই দু’টি বলয়ের হাত ধরেই আবর্তিত ছিল মহানগর বিএনপির রাজনীতি। তবে অভিজ্ঞ রাজনীতিকরা বলছেন দীর্ঘদিন পরে হলেও এই দু’টি বলয়ের বাইরে তৃতীয় শক্তির উত্থান হয়েছে মহানগর বিএনপিতে। আর এই তৃতীয় শক্তির উত্থানে অনেকটাই মাইনাসের পথে বিএনপির ওই দুই পরাশক্তির রাজনীতি। মহানগর বিএনপির রাজনীতিতে তাদের অবস্থান যেমন মিয়ম্লান  হয়ে পড়েছে তেমনি নবগঠিত কমিটিতেও নেই তাদের আধিপত্য।

জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আবুল কালাম ছিলেন সদ্য সাবেক মহানগর বিএনপির সভাপতি। মূলত এই তিন দশকের বেশী সময় ধরে সাবেক এমপি অ্যাডভোকেট আবুল কালামকে কেন্দ্র করেই মহানগর বিএনপির রাজনীতি আবর্তিত হয়ে আসছিল। অ্যাডভোকেট আবুল কালামের বাবা হাজী জালালউদ্দিন ছিলেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন নেতা। মূলত আশির দশক থেকেই শহর ও বন্দরের রাজনীতিতে সাবেক এমপি কালামের পরিবারের আধিপত্য ছিল। বিশেষ করে ১৯৯১ সালে অ্যাডভোকেট আবুল কালাম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে তিনি দায়িত্ব পেয়েছিলেন মহানগর বিএনপির। ওই কমিটি তথা মহানগরের রাজনীতিতে তিনিই ছিলেন সর্বেসর্বা। তবে ১৯৯৬ সালে আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতা গঠনের পর রাজনীতিতে নিস্ক্রিয় হয়ে পড়েছিলেন অ্যাডভোকেট আবুল কালাম। এরপর আওয়ামীলীগে যোগ দেন অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকার। তার নেতৃত্বে মহানগর বিএনপিকে সুসংগঠিত করা হয়। তবে ২০০১ সালে চারদলীয় জোট সরকারের আমলে বিএনপি আবারো ক্ষমতায় এলে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত অ্যাডভোকেট আবুল কালামকে আবারো মহানগর বিএনপির দায়িত্ব দেয়া হয়। বিএনপির শাসনামলে অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকার জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার পাশাপাশি বিআরটিসির চেয়ারম্যান হিসেবে মহানগরের রাজনীতিতেও নিজের আধিপত্য অক্ষুন্ন রেখেছিলেন। ২০০৭ সালে ওয়ান ইলেভেনের পরে অ্যাডভোকেট আবুল কালাম সংস্কারবাদী হিসেবে অভিযুক্ত হন। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পেলেও বিপুল ভোটে ধরাশায়ী হয়ে আবারো রাজনীতিতে নিস্ক্রিয় হয়ে পড়েন অ্যাডভোকেট আবুল কালাম। আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় আসলে একেবারেই নিস্ক্রিয় ছিলেন আবুল কালাম। পরে জেলা বিএনপির আহবায়ক হিসেবে দায়িত্ব পান অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকার। সে সুবাদে নারায়ণগঞ্জ শহর ও বন্দর বিএনপির রাজনীতিতেও প্রতিষ্ঠা পায় অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকারের অনুগামীরা। তৈমূর বলয়ের শহরে বিএনপির কমিটিতে সভাপতি হিসেবে সাবেক কমিশনার প্রয়াত জাহাঙ্গীর আলম, সেক্রেটারী পদে এটিএম কামাল ও সাংগঠনিক সম্পাদক পদে হাসান আহম্মেদ সম্মেলনের মাধ্যমে নির্বাচিত হন। তৈমূর বলয়ের বন্দর থানা কমিটিতে সভাপতি হিসেবে হাজী নুরুদ্দিন ও সেক্রেটারী পদে মাজাহারুল ইসলাম হিরন নির্বাচিত হন। এদিকে শহর ও বন্দরে বিএনপির রাজনীতিতে তৈমূর বলয়ের লোকজন প্রতিষ্ঠা পেতে থাকায় শহরে ও বন্দরে বিএনপির পাল্টা কমিটি গঠন করেন অ্যাডভোকেট আবুল কালামের অনুগামীরা। সেসময় শহর বিএনপি’র বিদ্রোহী গ্রুপের সভাপতি হিসেবে নুরুল ইসলাম সরদার, সেক্রেটারী হিসেবে অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন ও সাংগঠনিক সম্পাদক পদে অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপু ছিলেন। বন্দরে বিদ্রোহী কমিটির সভাপতি ছিলেন বন্দর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আতাউর রহমান মুকুল। এদিকে রাজনীতির পালাবদলে ২০১৭ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারী নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সাবেক তিনবারের এমপি আবুল কালামকে সভাপতি ও বিলুপ্ত নগর বিএনপির সেক্রেটারী এটিএম কামালকে সেক্রেটারী করে মহানগর বিএনপির কমিটি গঠন করা হয়। পরদিন নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির ২৩ সদস্যের আংশিক কমিটির তালিকা প্রকাশ করা হয়। ২৩ সদস্যের কমিটিতে সহ সভাপতি হলেন অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান, বিদ্রোহী কমিটির সভাপতি নুরুল ইসলাম সরদার, বন্দর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আতাউর রহমান মুকুল, বন্দর থানা বিএনপির সভাপতি হাজী নূরউদ্দিন, বিলুপ্ত নগর কমিটির সহ সভাপতি জাকির হোসেন, আইনজীবী নেতা সরকার হুমায়ূন কবির, ফখরুল ইসলাম মজনু, বেগম আয়েশা আক্তার। যুগ্ম সম্পাদক ২জন হলেন আজহারুল ইসলাম বুলবুল ও মাকছুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ। সাংগঠনিক সম্পাদক তিনজন হলেন আবদুস সবুর খান সেন্টু, ১৩নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর শওকত হাশেম শকু ও আবু আল ইউসুফ খান টিপু। সহ সাংগঠনিক সম্পাদক আওলাদ হোসেন, মনিরুল ইসলাম সজল, মাহাবুবউল্লাহ তপন। কোষাধ্যক্ষ মনিরুজ্জামান মনির। দপ্তর সম্পাদক হান্নান সরকার ও প্রচার সম্পাদক সুরুজ্জামান।

২০২০ সালের আগষ্টে মহানগর বিএনপির ১৫১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতেও সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পান সাবেক এমপি অ্যাডভোকেট আবুল কালাম। ওই কমিটির সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান, অ্যাডভোকেট মোঃ জাকির হোসেন, নূরুল ইসলাম সরদার, হাজী নুর উদ্দিন, আতাউর রহমান মুকুল, ফখরুল ইসলাম মজনু, বেগম আয়েশা সাত্তার, অ্যাডভোকেট সরকার হুমায়ূন কবির, অ্যাডভোকেট রিয়াজুল ইসলাম আজাদ, অ্যাডভোকেট রফিক আহমেদ, আমান উদ্দিন আমান, মোঃ মনিরুজ্জামান মনির, হাজী ফারুক হোসেন, মোঃ মনির হোসেন খান, হাজী শাহীন, সাধারণ সম্পাদক এটিএম কামাল। যুগ্ম সম্পাদক আবদুস সবুর সেন্টু, হাজী ইসমাইল হোসেন, আওলাদ হোসেন, সলিমুল্লাহ বাবু, মোঃ হাছান আহম্মেদ, মাহবুব উল্লাহ তপন, মনিরুল আলম সজল। সাংগঠনিক সম্পাদক আবু আল ইউছুফ খান টিপু, শওকত হাসেম শকু (কাউন্সিলর-নাসিক), আবুল কাউছার আশা।

এদিকে দীর্ঘ প্রায় ৪ দশক ধরেই মহানগর বিএনপিতে সাবেক এমপি অ্যাডভোকেট আবুল কালামের পরিবারের আধিক্য ছিল। তবে তাঁর পাশাপাশি বিএনপি থেকে বহিস্কৃত অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকারের আধিপত্যও ছিল। বিশেষ করে অ্যাডভোকেট আবুল কালামের নেতৃত্বাধীন কমিটিতে পরের অবস্থান ছিল তৈমূর আলম খন্দকারের অনুগামীদের। ২০২২ সালের ১৬ জানুয়ারী অনুষ্ঠিত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের তৃতীয় নির্বাচনে দলের সিদ্ধান্তের বাহিরে গিয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়ায় দল থেকে বহিস্কৃত হন জেলা বিএনপির আহবায়ক অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকার। তার পক্ষে নির্বাচনে কাজ করায় মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এটিএম কামালও বহিস্কৃত হন। এরপর থেকে জেলা বিএনপিতে ভারপ্রাপ্ত আহবায়কের দায়িত্ব পালন করে আসছেন মনিরুল ইসলাম রবি ও মহানগরে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন আসছিলেন আব্দুস সবুর সেন্টু।

এদিকে গত ১৩ সেপ্টেম্বর দুপুরে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির ৪১ সদস্য বিশিষ্ট আহবায়ক কমিটি প্রকাশ করা হয়। তবে এই কমিটি থেকে অনেকটাই মাইনাসের পথে সাবেক এমপি অ্যাডভোকেট আবুল কালামের পরিবার ও বহিস্কৃত জেলা বিএনপির আহবায়ক অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকারের পরিবার। বিশেষ করে নবগঠিত এই কমিটিতে রাখা হয়নি সাবেক এমপি অ্যাডভোকেট আবুল কালামকে। তার পুত্র নাসিকের ২৩নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আবুল কাউসার আশা ও চাচাতো ভাই বন্দর বিএনপি পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আতাউর রহমান মুকুলকে সহসভাপতি পদে রাখা হলেও কমিটি ঘোষণার ২৪ ঘন্টার ব্যবধানেই তারা পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। পূর্বের ন্যায় কমিটিতে আধিক্য নেই কালাম সমর্থক নেতাদের। অপরদিকে মহানগর বিএনপির রাজনীতি থেকে এক প্রকার ছিটকে গেছেন তৈমূর পরিবারও। তৈমূর বহিস্কৃত হলেও বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন ছোট ভাই মহানগর যুবদলের সাবেক সভাপতি নাসিকের কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ ও ভাগে যুবদল নেতা রশিদুর রহমান রশো। নবঘোষিত কমিটিতে তৈমূর পরিবারের কেউ ঠাই পায়নি। এমনকি নবগঠিত কমিটিতে স্থান মেলেনি তৈমূর অনুগামী নেতাদের।

এদিকে নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির ৪১ সদস্য বিশিষ্ট আহবায়ক কমিটি যাদের নেতৃত্বে এসেছে আহবায়ক সাখাওয়াত হোসেন খান এবং সদস্য সচিব হিসেবে আবু আল ইউসুফ খান টিপু'কে তৃতীয় শক্তি হিসেবেই দেখছেন দলটির নেতাকর্মীরা। কারণ ২০১৬ সালের ২২ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের দ্বিতীয় নির্বাচনে মেয়র পদে কালাম ও তৈমূরের অনাগ্রহে বিএনপির ধানের শীষের মনোনয়ন পেয়ে যান অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান। ওই নির্বাচনে তিনি নাসিকের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর কাছে ধরাশায়ী না হলে হয়তো সেই সময় থেকেই মহানগর বিএনপির রাজনীতিতে তৃতীয় শক্তির উত্থান ঘটতো। তবে নির্বাচনের কিছুদিন পরেই অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানের বিরুদ্ধে এমপি শামীম ওসমানের কাছ থেকে ২ কোটি টাকা নিয়ে আত্মসাতের অভিযোগ তোলেন অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপু। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের দ্বিতীয় নির্বাচনে অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানের প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট ছিলেন অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপু। যে কারণে উত্থাপিত অভিযোগ বেশ হৈচৈ ফেলে গোটা নারায়ণগঞ্জ জুড়ে। এরপর আদালতপাড়াতেও দীর্ঘদিন একে অপরের বিরোধী ছিলেন সাখাওয়াত ও টিপু। যদিও তাদের মধ্যে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল কিন্তু সেই ২ কোটি টাকা নিয়ে হেরফেরের অভিযোগকে কেন্দ্র করে মহানগর বিএনপিতেও তাদের মধ্যে বিবাদ ছিল। কিন্তু চলতি বছরের মাঝামাঝিতে বিএনপির কর্মসূচীতে তাদের মধ্যে একাত্ম হতে দেখা যায়। এরপর কেন্দ্রীয় বেশ কিছু কর্মসূচীতেও তারা যুগপৎভাবে পালন করে আসছিলেন। সর্বশেষ মহানগর বিএনপির যে কমিটি গঠন করা হয়েছে এতে দায়িত্বে এসেছেন তারা দুইজন। আর কমিটিতেও যারা স্থান পেয়েছেন তাদের বেশীরভাগই সাখাওয়াত ও টিপুর অনুগামী কিংবা ঘনিষ্টজন। এতে করে বিবদমান ওই দুই নেতার মিলনে মহানগরে বিএনপির তৃতীয় শক্তির উত্থান ঘটেছে বলে মনে করছেন দলটির অনেক নেতাকর্মী। তবে তাদের এই তৃতীয় শক্তি আগামী দিনে কতটা শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারবে সেটা সময়ই বলে দিবে।

Islams Group
Islam's Group