News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা সোমবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০২৩, ১৬ মাঘ ১৪২৯

অবলুপ্তির পথে নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক ঐতিহ্য


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | ফরিদ আহমেদ রবি : প্রকাশিত: জানুয়ারি ২১, ২০২৩, ১০:৫০ পিএম অবলুপ্তির পথে নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক ঐতিহ্য

নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক ঐতিহ্য সম্পর্কে নতুন করে কিছু বলার নেই। সারা দেশবাসী এ সম্পর্কে সম্যক অবগত। দেশের বিভিন্ন ক্রান্তিকালে, রাজনৈতিক আন্দোলনে নারায়ণগঞ্জের ভূমিকা নিঃসন্দেহে দেশের অন্যান্য যেকোনো স্থানের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়ে রয়েছে। স্বাধীনতা পূর্ববর্তী সময়ে ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধে নারায়ণগঞ্জের ভূমিকা অগ্রগণ্য। জাতীয় প্রয়োজনে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত  বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে স্থানীয় নেতৃবৃন্দের অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে দেশের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বেও নারায়ণগঞ্জের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নেতার প্রতিনিধিত্ব ছিল লক্ষণীয়। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে, বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের পর সামরিক ও স্বৈরাচার বিরোধী বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে নারায়ণগঞ্জবাসীর ভূমিকা এখনো জ্বলজ্বলে। এক্ষেত্রে নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং কর্মী সমর্থকদের অবদান অনস্বীকার্য। জাতীয় স্বার্থে যেকোনো আন্দোলন সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে নারায়ণগঞ্জ দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক বিশেষ অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। জাতীয় ইস্যুতে বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে নারায়ণগঞ্জের ভূমিকা এবং নারায়ণগঞ্জবাসীর আত্মত্যাগ ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে এবং থাকবে অনন্তকাল।

প্রাক্তন প্রাদেশিক এবং বর্তমানে দেশের রাজধানী হওয়ায় ঢাকাকে ঘিরেই সব রাজনৈতিক কর্মসূচি আবর্তিত হয়, সেটাই স্বাভাবিক। লক্ষণীয় বিষয়, এসব কর্মসূচির সাফল্য অনেকাংশ নির্ভর করতো নারায়ণগঞ্জবাসীর সক্রিয় অংশগ্রহণের উপর। এখনও সে ধারা অব্যাহত রয়েছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে নারায়ণগঞ্জের সেই রাজনৈতিক ঐতিহ্য আজ বিলুপ্তির পথে। রাজনীতির সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত নারায়ণগঞ্জ আজ রাজনীতির গৌরবময় অবস্থান হারিয়ে সংবাদ মাধ্যমে দলীয় অন্তঃকলহের প্রধান শিরোনাম হচ্ছে প্রতিনিয়ত। দলীয় অন্তঃকলহের কারণে কোন কোন ক্ষেত্রে কলঙ্কজনক এমন সব ঘটনার উদ্ভব হচ্ছে যা সুষ্ঠু রাজনীতির পরিপন্থী। রাজনীতি সচেতন জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ এবং যোগ্য নেতৃত্বের কারণেই নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অবস্থান সারা দেশেই ছিল রোল মডেল। রাজনীতি সচেতন সেই সাধারণ জনগণ এখন আর রাজনীতির প্রতি তেমন আকর্ষণ বোধ করে না। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে দুর্বৃত্তায়ন, দলীয় অন্তঃকলহ, ত্যাগী নেতা কর্মীর অবমূল্যায়নসহ নানা অনিয়ম এর মূল কারণ। নারায়ণগঞ্জে রাজনীতি এখন আর রাজনীতিবিদদের নিয়ন্ত্রণে আছে বলে মনে হয় না। অর্থবিত্তের প্রভাবে অনেকেই এখন রাজনীতিতে প্রভাবশালী অবস্থায় অবস্থান করছে। সমাজে চিহ্নিত অনেক অপরাধীও বিভিন্ন দলের নেতাকর্মী হয়ে গেছে। ফলে আদর্শের জায়গা থেকে রাজনীতি এখন পর্যবাসিত হয়েছে বিভিন্ন অপকর্মের হোতা, দুর্বৃত্তদের আশ্রয়স্থল হিসেবে।

দেশের সবচেয়ে পুরনো এবং স্বাধীনতা সংগ্রামসহ মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রধান ঘাঁটি হিসেবে নারায়ণগঞ্জের পরিচিতি সর্ববিধিত। দলটির সূচনালগ্ন থেকেই নারায়ণগঞ্জের অসংখ্য গুণী নেতা দলটির সাথে সম্পৃক্ত থেকে দলকে সমৃদ্ধ করেছে, দলীয় কার্যক্রমে অবদান রেখেছে। স্বাধীনতা পূর্ববর্তী ভাষা আন্দোলন, ৬ দফা, ১১ দফা আন্দোলনসহ স্বাধিকার আন্দোলনে নারায়ণগঞ্জের অবদান স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ের যেকোনো আন্দোলন সংগ্রামেও নারায়ণগঞ্জের অংশগ্রহণ, নারায়ণগঞ্জ বাসীর ত্যাগ, জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃত। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বেও ছিল নারায়ণগঞ্জের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রতিনিধিত্ব। আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত নারায়ণগঞ্জ ছিল আওয়ামী লীগের চালিকাশক্তি। নানা বাধা বিপত্তি, লোভনীয় প্রস্তাব, হামলা মামলাসহ প্রাণহানির আশংকা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীরা আদর্শচ্যুত হয়নি। প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিবেশেও যোগ্য নেতৃত্বের গুণে সবাই একতাবদ্ধ ছিল। অথচ দল যখন ক্ষমতায়, হামলা মামলার ভয় নেই, তখন দেশের ঐতিহ্যবাহী দলটির অন্তঃকলহ, দল অন্তপ্রাণ কর্মী সমর্থকদের জন্য হয়ে উঠেছে অস্বস্তিকর। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার কারণে আদর্শহীন অনেক লোভী, চিহ্নিত অপরাধী দলটিতে অনুপ্রবেশ করেছে যে কারণে ত্যাগী নেতাকর্মীদের অনেকেই বঞ্চিত হয়েছে যোগ্য সম্মান প্রাপ্তিতে। দীর্ঘদিন আওয়ামী রাজনীতির সাথে জড়িত অনেক নেতা কর্মী এখন দলের কোন পর্যায়েই ঠাঁই পাচ্ছে না, উপরন্তু অনুপ্রবেশকারীদের দলে পদ পদবী পেতে কোন সমস্যাই হচ্ছে না। অর্থবিত্তের জোরে অনেকেই রাতারাতি আওয়ামী লীগার বনে যাচ্ছে। তাদের দাপটে ত্যাগী নেতা কর্মীরা কোণঠাসা অবস্থায় থেকে দলের প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে।

সচেতন মহলের মতে দলের এমন বিশৃঙ্খল অবস্থার জন্য দায়ী নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃত্বে বিভক্তি। আওয়ামী লীগের এ বিভাজন কোন অবস্থাতেই দলটির জন্য মঙ্গল বয়ে আনছে না। একই দলের সদস্য হয়েও এই বিভাজনের কারণে একজন আরেকজনের শত্রুতে পরিণত হয়েছে। যে দুজন নেতা নেত্রীকে কেন্দ্র করে এই বিভাজন, তাঁদের নেতৃত্ব গুণ, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং জনপ্রিয়তা প্রশ্নাতীত। আওয়ামী লীগের ক্রান্তিকালে তাঁদের অবদান অনস্বীকার্য। একসময় তাঁদের পারস্পরিক সুসম্পর্ক ছিল অনেকের জন্যই অনুকরণীয়! তাঁদের মাঝে বিভক্তির কারণ যাই হোক না কেন তা নিরসন করা কি সম্ভব নয়? না কি কোন মহল স্বীয় স্বার্থে এই বিভক্তিকে জিইয়ে রাখছে, আরো উসকে দিচ্ছে? ব্যক্তিগত পর্যায়ে একজনের সাথে আরেকজনের সম্পর্ক নষ্ট হয়ে থাকলেও তার প্রভাবে দলীয় ঐক্যের বিভক্তি কতটা যুক্তিসঙ্গত? একই দল এবং আদর্শে বিশ্বাসী দলের প্রতিটি সদস্যের যেখানে দলীয় ঐক্য বজায় রাখাটাই মূল বিষয় হওয়া উচিত, সেখানে দুর্ভাগ্যজনকভাবে ঐতিহ্যবাহী নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগ আজ দ্বিধা বিভক্ত। নেতা কর্মীদের মত সাধারণ সমর্থকদের মধ্যে বিভাজন পরিলক্ষিত না হলেও তার প্রভাব অবশ্যম্ভাবী। সাধারণ কর্মী সমর্থকগণ বিভক্তিজনিত কারণে প্রকাশ্যে আসতে বিব্রত বোধ করছে, একটি পক্ষের সমর্থক হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার ভয়ে। কারণ দুটি পক্ষই পরস্পরবিরোধী যুদ্ধংদেহি অবস্থানে রয়েছে। দুটি পক্ষই নিয়মিত পরস্পরের বিরুদ্ধে বিষোদগার করে যাচ্ছে বিভিন্ন সভা সমাবেশে, বক্তৃতা বিবৃতিতে। এতে কার কতটুকু লাভ বা ক্ষতি হচ্ছে তা প্রশ্নসাপেক্ষ হলেও আওয়ামী লীগ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এতে কোন সন্দেহ নেই। পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব তাঁদের দীর্ঘ দিনের অর্জিত সুনাম হারাচ্ছে। অথচ তাঁদের ঐক্যবদ্ধ অবস্থান দলের ঐতিহ্য টিকিয়ে রেখে দলকে আরও শক্তিশালী অবস্থানে উন্নীত করতে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের এই দ্বিধাবিভক্তি সম্পর্কে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ যথেষ্ঠ ওয়াকিবহাল, তা সত্ত্বেও বিভেদ মেটাতে তেমন কার্যকর কোন ভূমিকা চোখে পড়ে না। সেক্ষেত্রে এ প্রশ্ন জাগতেই পারে, কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ ও কি তাহলে দ্বিধাবিভক্ত? তেমনটি হলে নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশংকা থেকেই যায়। তেমন দিন যেন না আসে, সে লক্ষ্যে উভয় পক্ষকেই জেদাজেদি ছেড়ে এগিয়ে আসতে হবে দলীয় স্বার্থে। কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দকেও পালন করতে হবে দায়িত্বশীল ভূমিকা। প্রয়োজনে কঠোর হাতে দমন করতে হবে অন্তঃকলহ। আওয়ামী লীগের অতীত গৌরব ফিরিয়ে আনতে দলীয় অন্তঃকলহ দমনের কোন বিকল্প নেই। দলীয় অন্তঃকলহ নিরসন যেমন ঐতিহ্যবাহী আওয়ামী লীগের স্বীয় ঐতিহ্য বজায় রাখতে সক্ষম হবে, পাশাপাশি অক্ষুণœ থাকবে দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামে নারায়ণগঞ্জের গৌরবময় অবদানের স্বীকৃতি।

দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি বরাবরই নারায়ণগঞ্জে শক্তিশালী অবস্থানে থেকেই রাজনৈতিক কর্মকা-ে সক্রিয় থেকেছে। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে নারায়ণগঞ্জের অনেক নেতাই দাপটের সাথে প্রতিনিধিত্ব করেছে। ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে বিএনপির সৌজন্যে নারায়ণগঞ্জের একাধিক নেতা মন্ত্রীর আসনেও বসেছেন। বিভিন্ন দল থেকে আসা ভিন্ন ভিন্ন আদর্শের অসংখ্য নেতাকর্মীর ভিড়ে বিএনপি নারায়ণগঞ্জে মোটামুটি অভিন্ন নেতৃত্বের অধীনেই তাদের দলীয় কার্যক্রম পরিচালনা করতে পেরেছে। পদ পদবী নিয়ে মতভিন্নতা থাকলেও দলীয় কার্যক্রমে সবার ঐক্যবদ্ধ অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। দীর্ঘদিন বিরতির পর সম্প্রতি রাজনৈতিক বিভিন্ন কর্মসূচিতে বিএনপির অংশগ্রহণ কিছুটা ভিন্নরূপে পরিলক্ষিত হচ্ছে। একই কর্মসূচি পালিত হচ্ছে বিভিন্ন দল উপদলে বিভক্ত হয়ে। আওয়ামী লীগের মতো বিভক্তি শুধু দুটি মেরুতে সীমাবদ্ধ নেই, বিএনপির বিভক্তি তিন বা তারও বেশি অংশে বিস্তৃত। বিএনপির বিভক্তি মূলত নেতৃত্ব নিয়ে। নারায়ণগঞ্জের নেতৃত্ব নির্বাচনে বেশ নাটকীয় কিছু ঘটনার জন্ম হয়েছে। কমিটি গঠনে পাল্টাপাল্টি লেগেই রয়েছে। মনে হয় কর্মী সমর্থকের চেয়ে নেতার সংখ্যাই বেশি। কেন্দ্র থেকে কমিটি গঠন করার পর স্থানীয় পর্যায়ে অসন্তোষ এবং কমিটি থেকে অনেকের পদত্যাগ, কেন্দ্রকে বাধ্য করেছে কমিটি ভেঙে দিয়ে আবারও নতুন কমিটি করতে। বর্তমান কমিটির আয়ু কতদিন তাও দেখার বিষয়।

এরশাদ সরকারের পতনের পর দীর্ঘ সময় আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি দেশের শাসন ক্ষমতায় ছিল এবং আছে। জনসমর্থনের দিক থেকেও এ দুটি দলই এগিয়ে রয়েছে। কেন্দ্রীয় পর্যায়ে বিভক্তির তেমন উল্লেখযোগ্য কোন দৃষ্টান্ত না দেখা গেলেও নারায়ণগঞ্জে দুটি দলই বিভিন্ন দল উপদলে বিভক্ত। দল দুটির বিভক্ত অবস্থান নারায়ণগঞ্জবাসীর জন্য এবং নিজ নিজ দলের জন্য কোন মঙ্গল বয়ে আনছে না বরং নারায়ণগঞ্জের ঐতিহ্যমন্ডিত রাজনৈতিক চরিত্র কলুষিত হচ্ছে এবং তা অব্যাহত থাকবে যতদিন না দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল দুটির বিভক্তি নিরসন হবে। দল-মত নির্বিশেষে নারায়ণগঞ্জের শান্তিপ্রিয় মানুষ চায় সুষ্ঠু রাজনীতির সহাবস্থান। সুষ্ঠু রাজনীতির স্বার্থে, সর্বোপরি নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে রাজনৈতিক দলগুলো দলীয় অন্তঃকলহ এবং আন্তঃদলীয় কোন্দল এড়িয়ে নারায়ণগঞ্জকে গড়ে তুলবে রাজনৈতিক সহাবস্থানের আদর্শ হিসেবে, তেমনটিই প্রত্যাশা।

লেখক : বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানি ও পোশাক শিল্পের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা।

Islams Group
Islam's Group