News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা সোমবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০২৩, ১৬ মাঘ ১৪২৯

শহরের ২ হাসপাতালের সেবা নিয়ে নানা প্রশ্ন


বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানী ও পোশাক শিল্পের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা। | ফরিদ আহমেদ রবি প্রকাশিত: জানুয়ারি ৫, ২০২৩, ১০:১৮ পিএম শহরের ২ হাসপাতালের সেবা নিয়ে নানা প্রশ্ন

নাগরিকের মৌলিক অধিকার সমূহের অন্যতম চিকিৎসা। বাংলাদেশে মৌলিক অধিকার হিসেবে চিকিৎসা সেবা কোন পর্যায়ে আছে তা উপলব্ধি করতে নিচের ঘটনাটি হতে পারে প্রকৃষ্ট উদাহরণ!

বাড়ির পাশেই ছেলেটি স্ত্রী সন্তান এবং বাবা মাকে নিয়ে ভাড়া বাড়িতে বাস করে। বিভিন্ন ধরনের ছোটখাটো কাজ করে সংসার চালায়। একটি গার্মেন্টে চাকরি করতো, গার্মেন্টস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কখনো দিনমজুরি, কখনো রিক্সা চালানোর মতো কাজ করে। মাঝে মাঝে এলাকার বিভিন্ন বাড়িতে ফুট ফরমাস খাটে। পাশের বাড়ির একটি নারকেল গাছ থেকে নারকেল পড়ার জন্য গাছে ওঠে। দুর্ঘটনাক্রমে গাছ থেকে পড়ে গিয়ে হাত এবং পাঁজরের হাড় ভেঙে যায়। সাথে সাথে নারায়ণগঞ্জ সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে কোমড়ের হাড়েও ফ্র্যাকচার চিহ্নিত হয়। রোগী ভর্তি না করে ঢাকা মেডিকেলে রেফার্ড করা হয়। পাশের ক্লিনিকের দালালদের দৌরাত্ম্যে ঢাকা মেডিকেলের পরিবর্তে ভর্তি হয় উক্ত ক্লিনিকে। পরদিন ক্লিনিকের ডাক্তার যিনি সদর (ভিক্টোরিয়া) হাসপাতালের সাথেই সংযুক্ত, রোগী দেখে খুব বড় অংকের টাকার বিনিময়ে চিকিৎসার প্রস্তাব দেয়। এত টাকার সংকুলান সম্ভব নয় বলে রোগী নিয়ে ঢাকা মেডিকেলেই যাওয়া হয়। ছেলেটি কোমড়ের আঘাত জনিত কারণে হাঁটতে অক্ষম বিধায় কষ্টেসৃষ্টে কিছু টাকা জোগাড় করে এম্বুলেন্সে তাকে নেয়ার ব্যবস্থা করা হয়। ঢাকা মেডিকেলের জরুরী বিভাগ বিভিন্ন কাগজপত্র দেখে তাকে আউট ডোরে পাঠিয়ে দেয়। আউটডোরের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এম আর আই এবং সিটি স্ক্যান করাতে বলেন বাইরের নির্ধারিত একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে। পরীক্ষাগুলো ব্যায়বহুল এবং সময় সাপেক্ষ হওয়ায় রোগীর পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয় ছেলেটিকে ভর্তি করিয়ে নেয়া হোক এবং তারা বাইরে থেকে পরীক্ষাগুলো করিয়ে চিকিৎসককে দেখাবেন বলে প্রতিশ্রুতি প্রদান করে। সদাশয় বিশেষজ্ঞ মহোদয় তাতে রাজি না হয়ে বলে দেন উক্ত পরীক্ষা সমূহ না করা পর্যন্ত রোগী ভর্তি করা সম্ভব নয়। চলাফেরায় অক্ষম রোগী নিয়ে অভিভাবকরা করেন মহা বিপদে, ওইদিন পরীক্ষা সম্পন্ন করে চিকিৎসকে দেখানো সম্ভব ছিলনা, তার মানে ভর্তি অনিশ্চিত! রোগীকে আউটডোরে রাখারও সুযোগ নেই। দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে মোবাইলে আমার সাথে যোগাযোগ করা হলে একজন পরিচিত লোকের সাথে যোগাযোগ করতে বলি। প্রয়োজনে সাংবাদিকদের সাথে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেই।

ভাগ্যক্রমে ওরা একজন দালালের খোঁজ পায় এবং দালালের পরামর্শক্রমে পুরোনো সব কাগজপত্র ছিড়ে ফেলে নতুনভাবে জরুরী বিভাগে যায় এবং ভর্তির ব্যবস্থা হয়ে যায়। এজন্য তাদেরকে ব্যয় করতে হয় মোটা অংকের টাকা। পূর্বতন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী যেসব পরীক্ষা বাইরে করার কথা, উৎকোচ প্রদানের মাধ্যমে তা ঢাকা মেডিকেলেই সম্পন্ন হয়। দীর্ঘ চিকিৎসা শেষে ছেলেটিকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হয় সম্পূর্ণ বিশ্রামে থাকার পরামর্শ দিয়ে। ছেলেটি এখন অনেকটা সুস্থ, ধীরেসুস্থে হাঁটাচলাও করতে পারে। কাজে যোগ দিতে হয়তো আরো কিছুটা সময় লাগবে। ওর চিকিৎসা সংক্রান্ত যাবতীয় ব্যয় এলাকার সজ্জন ব্যক্তিদের বদান্যতায় সম্পন্ন হয়েছে। কাজ করতে অক্ষম হয়ে যাওয়ায় ওর পরিবার এখন ভীষণ অর্থকষ্টে আছে। ছেলেটির অসুস্থ পিতা কোনরকমে ছোটখাটো কাজ করে সংসার খরচ এবং ছেলের চিকিৎসার ব্যয় নির্বাহ করছে।

এমন ঘটনা প্রতিদিনই ঘটছে। দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোর চিত্র এবং হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের আচরণ সব জায়গাতে প্রায় একই রকম। এ ধরনের ঘটনা কোন অবস্থাতেই কাম্য নয়। প্রতিদিন সংঘটিত এ ধরনের অসংখ্য ঘটনার এটি একটি সামান্য উদাহরণ মাত্র। উপরের ঘটনাটি বিশ্লেষণ করলে অনেকগুলো প্রশ্নের উদয় হয়। সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত জেলা পর্যায়ের একটি প্রাচীনতম হাসপাতাল জরুরি অবস্থায় চিকিৎসা সেবা দিতে অক্ষম কেন? অক্ষম হয়ে থাকলে উক্ত হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক বাইরের ক্লিনিকে চিকিৎসা সেবা কিভাবে প্রদান করেন?

নারায়ণগঞ্জের মত একটি গুরুত্বপূর্ণ জেলা শহরের সরকারি হাসপাতাল জরুরী চিকিৎসা দিতে ব্যর্থ, বিষয়টি মানতে খুব কষ্ট হয়। অথচ হাসপাতালগুলোতে প্রায় প্রতিটি বিষয়ের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রয়েছেন। চিকিৎসা প্রদানের যাবতীয় আধুনিক সরঞ্জামাদিও রয়েছে। তারপরও কেন জরুরী চিকিৎসার প্রয়োজনে ঢাকামুখী হতে হয়? হাসপাতালের নিয়োগপ্রাপ্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগণ নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন ক্লিনিক অথবা বেসরকারি হাসপাতালে ঠিকই চিকিৎসা প্রদান করছেন, তাহলে নিজ কর্মস্থলে রোগীরা চিকিৎসা সেবা পাবে না কেন? হাসপাতালে ভিজিটের টাকা পাবেন না বলে? সরকার তো আপনাদের মোটা অংকের বেতন ভাতা প্রদান করে। তাতে না পোষালে ছেড়ে দিন চাকরি। অবশ্য তাতেও মস্ত সমস্যা, সরকারি চিকিৎসক বলেই না আপনাদের এত চাহিদা! তাহলে কি অসৎ চিকিৎসকদের এমন অপকর্ম চলতেই থাকবে?

এসব অনিয়ম প্রতিকারের জন্য কি কোন কর্তৃপক্ষ নেই? এসব অনিয়ম প্রতিকার করা না গেলে নামেই এসব বড় বড় হাসপাতাল থাকার কি-ই বা মানে? অনিয়ম আর অব্যবস্থাপনায় জর্জরিত নারায়ণগঞ্জের হাসপাতালে চিকিৎসা না পেয়ে বড় আশা নিয়ে ঢাকামুখী হয়েই বা কি লাভ? সেখানেও তো কম ভোগান্তি পোহাতে হয় না!

দুর্ঘটনা জনিত কারণে একজন চলৎ-শক্তিহীন রোগীকে নিয়ে ঢাকা মেডিকেলের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকই বা কি দায়িত্ব পালন করলেন? যন্ত্রণা কাতর অসহায় রোগীটিকে তাৎক্ষণিকভাবে কেন ভর্তি করা হলো না? যেসব পরীক্ষা হাসপাতালেই করা সম্ভব তা কেন বাইরের ক্লিনিক থেকে করে আনতে বলা হলো? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে হাসপাতালগুলোতে চরম অব্যবস্থাপনা, চিকিৎসকদের দাযয়িত্বহীনতা এবং অতিমাত্রায় অর্থলোভী চরিত্রের চিত্রই ফুটে ওঠে। সরকারি হাসপাতালে নিযয়োজিত প্রত্যেক চিকিৎসকই পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্য বেতন ভাতা পেয়ে থাকেন। তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন মানে হাসপাতালে আগত রোগীকে চিকিৎসা প্রদান। রোগীর সেবায় হাসপাতালের অবকাঠামোগতা সবরকম সুযোগ সুবিধা প্রদান। উল্লেখিত ঘটনায় এর কোনটিই পালন করা হয়নি। যেমন হয়না আরও অনেক ক্ষেত্রে। ভিক্টোরিয়া হাসপাতালের চিকিৎসক হাসপাতালে চিকিৎসা সম্ভব নয় জানালেও ক্লিনিকে অনেক অর্থের বিনিময়ে চিকিৎসা সম্ভব বলে জানা যায়। ঢাকা মেডিকেলে রোগী ভর্তি না করে আউট ডোরের চিকিৎসক অমানবিক আচরণের পরিচয় দিয়েছেন, পাশাপাশি হাসপাতালে ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও তার পছন্দের ডায়াগনোস্টিক সেন্টারে এম আর আই,সিটিস্ক্যান করতে পাঠিয়ে অর্থলোভী পিশাচের কাজ করেছেন। একজন চলৎ শক্তিহীন অসহায় গরীব রোগীও তার কাছে সামান্যতম সহানুভূতি পায়নি। অথচ বিষয়টি সহানুভূতি বা তার করুনার ছিলনা, ছিল বেতনভুক্ত একজন চিকিৎসক হিসেবে তার দায়িত্ব পালনের। এই যে, সে তার দায়িত্ব পালন করলো না, তা কি শাস্তি যোগ্য অপরাধ নয়? পরীক্ষার জন্য বাইরে পাঠানোর কারণও স্পস্ট। এ অপরাধের জন্য তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান চাকরিবিধির মধ্যেই রয়েছে। সরকারি চিকিৎসক গণ সম্ভবত এসব বিধানের আওতামুক্ত! তা নাহলে তারা অপরাধ জেনেও এধরণের অপকর্মের সাহস পায় কোত্থেকে? চাকরির পাশাপাশি বিভিন্ন ক্লিনিক এবং বেসরকারি হাসপাতালে সংশ্লিষ্ট থেকে নিজ হাসপাতালের রোগীদের এসব ক্লিনিকে পাঠানোই যেন তাদের মূল কাজ। হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য যেসব যন্ত্রপাতি রয়েছে তার অধিকাংশই বিকল বলে সারা বছরই অ ব্যবহৃত থাকে যাতে তাদের পছন্দের ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টার গুলো ব্যবসা করতে পারে, যেখানে তাদেরও আর্থিক লাভ জড়িত! প্রতিটি হাসপাতাল কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে দালাল চক্র যারা বিভিন্ন ক্লিনিক এবং বেসরকারি হাসপাতালের হয়ে কাজ করে, এ কাজে চিকিৎসকগণও জড়িত। নির্ধারিত একজন চিকিৎসকের সেবা হাসপাতালে না পেলেও দালালদের কল্যাণে ক্লিনিকে বা বেসরকারি হাসপাতালে উক্ত চিকিৎসকের চিকিৎসা সেবা ঠিকই পাওয়া যায়। আরেক শ্রেণীর দালাল রয়েছে যারা হাসপাতালে ভর্তি করা থেকে শুরু করে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা হাসপাতালেই সম্পন্ন করার ব্যবস্থা করে থাকে তাদের কাছ থেকে হাসপাতালের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী আর্থিকভাবে লাভবান হয়। উভয় ধরনের দালাল চক্রের মধ্যে তুলনামূলকভাবে দ্বিতীয় শ্রেণীর দালালগণ কিছুটা হলেও রোগীর উপকারে আসে। স্বাভাবিক নিয়মে ভর্তি হতে পারলে এসব দালালরাও নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতো। সরকারি কোষাগার থেকে শত শত কোটি টাকা চিকিৎসা সংক্রান্ত কাজে ব্যয় করা হলেও তার সুফল সাধারণ মানুষ পুরোপুরি পাচ্ছে না মূলত অর্থলোভী কিছু চিকিৎসক এবং হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কারণে। দায়িত্বশীল এবং কর্তব্যপরায়ণ চিকিৎসক যে নেই তা নয়, তার প্রমাণ ছেলেটি দ্বিতীয় ধাপে ঠিকই ভর্তি হতে পেরেছে এবং সুচিকিৎসাও পেয়েছে। অল্প সংখ্যক দায়িত্বহীন, অর্থলোভী চিকিৎসকের কারণে গোটা চিকিৎসক সমাজ আজ প্রশ্নের সম্মুখীন। এসব অনিয়ম দূরীকরণে আইন থাকলেও প্রয়োগ হয় না বলেই আজকের এই অচলাবস্থা। জাতি এই অচলাবস্থার সমাপ্তি দেখতে চায়। চিকিৎসা সেবার মত মহান পেশা আপন মহিমায় সমুজ্জল হোক সাধারণ মানুষ তেমনটিই প্রত্যাশা করে। এক্ষেত্রে সর্বাগ্রে এগিয়ে আসতে হবে চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত দাযয়িত্বশীল, কর্তব্য পরায়ন চিকিৎসক সমাজকে।

Islams Group
Islam's Group