News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা সোমবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০২৩, ১৬ মাঘ ১৪২৯

মৌমিতা বিষফোঁড়া আপত্তি সবার


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট প্রকাশিত: জানুয়ারি ১৯, ২০২৩, ১০:২২ পিএম মৌমিতা বিষফোঁড়া আপত্তি সবার

নারায়ণগঞ্জ শহরে গণপরিবহন সেক্টরে বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে মৌমিতা বাস। শুরুর দিকে চাষাঢ়া থেকে ধানমন্ডি হয়ে চন্দ্রা পর্যন্ত বাস চালু হওয়ায় বাসিন্দারা খুশি হলেও বর্তমানে মৌমিতা নিয়ে আপত্তি উঠেছে সকলের। প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, সুধীজন সকলের আপত্তির কেন্দ্রে মৌমিতা বাস। এই আপত্তির অন্যতম কারণ বাসটির বেপরোয়া চলাচল।

নারায়ণগঞ্জ শহরে ঠিক কতগুলো মৌমিতা বাস চলাচল করে সেই হিসেব নেই কারও কাছে। তবে বাস স্টাফদের সূত্র বলছে এই সংখ্যা দুইশতের অধিক। যদিও তাদের নারায়ণগঞ্জ শহরে প্রবেশ করার কোন পারমিশন নেই। তবুও নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে চাষাঢ়া, মেট্রোহল মোড়, মিশনপাড়া, লিংক রোড দাপিয়ে বেড়াচ্ছে মৌমিতা। শুধু যাত্রী পরিবহনেই সীমাবদ্ধ নয় তাঁরা, গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে বাস থামিয়ে পুরো শহরে যানজট তৈরি করার অন্যতম কারিগরও এই বাসটি।

ছোট শহরে বাসের আধিক্য এবং যত্রতত্র বাস থামিয়ে রেখে যানজট তৈরি করায় সরাসরি আপত্তি তুলেছেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী। গত বছরের বাজেট অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে প্রায় সময়েই এই বাসের বিরুদ্ধে আপত্তি তোলেন। একই সাথে প্রশ্ন তোলেন প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে। বিভিন্ন সময় প্রশাসন ম্যানেজ হয়ে যায় বা বদলির ভয়ে নীরব থাকে বলেও মন্তব্য করেন আইভী।

সর্বশেষ নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান মাসুম এই বাস বন্ধের দাবিতে ১৫ দিনের আল্টিমেটাম ঘোষণা করেন। ১৫ দিনের মধ্যে চাষাঢ়ায় মৌমিতার অত্যাচার বন্ধ না হলে নাগরিক সমাজকে সাথে নিয়ে মৌমিতা বাস প্রতিহত করার ঘোষণা দেন তিনি। মৌমিতা প্রশ্নে বার বার প্রশাসনের দিকে আঙ্গুল তুললেও জবাবে কিছুই বলেননি জেলা প্রশাসক মঞ্জুরুল হাফিজ।

কি সমস্যা মৌমিতায়?

নারায়ণগঞ্জ শহর থেকে যারা নিয়মিত যাতায়াত করেন তাঁরা মৌমিতা বাসের সহায়তায় ঢামেক, নিউমার্কেট, ধানমন্ডি, চন্দ্রা যেতে পারেন সহজে। কিন্তু আপত্তি কেবল চাষাঢ়া, মিশনপাড়া, খানপুর ও মেট্রোহল মোড়ে তাদের অবাধ নৈরাজ্য নিয়ে। মূলত যাত্রীর চাইতে বাসের সংখ্যা বেশি হয়ে যাওয়া এবং অফিস সময়ে চাষাঢ়া মোড়ে ১২-১৫টি বাস দাঁড় করিয়ে রেখে শহরকে স্থবির করে দেয়। কোন কোন ক্ষেত্রে প্রশাসনের গাড়ির সাইরেনকেও পাত্তা দেয় না চালকরা। শহর থেকে বের হবার পথ আটকে রাখায় যানজট বাড়তে বাড়তে খানপুর এবং দুই নম্বর রেলগেইট ছাড়িয়ে যায়।

সরেজমিনে দেখা যায়, ‘মেট্রোহল মোড় থেকে চাষাঢ়া বায়তুল আমান পর্যন্ত দূরত্ব মাত্র সাড়ে চারশত মিটার। এটুকু দূরত্বে একটি মৌমিতা বাস যাত্রী তোলার জন্য অন্তত ৬টি স্থানে দাঁড়িয়ে থাকে। সেসব স্থান হচ্ছে আমলাপাড়া থেকে মিশনপাড়া আসার গলি, হকার্স মার্কেটের সামনে, খাজা সুপার মার্কেটের সামনে, শহীদ মিনারের সামনে, শান্তনা মার্কেটের নিচে এবং বায়তুল আমান ভবনের পাশে। প্রতিটি স্থানে গাড়ি আঁকাবাঁকা করে থামিয়ে রেখে দীর্ঘ সময় যাত্রী তোলা ও ডাকাডাকি চলে। একসাথে ৩-৪টি মৌমিতা একই রাস্তা দখল করায় আটকে যায় অন্যান্য যানবাহন।’

বাসের এমন কীর্তির বিষয়ে কথা হয় মৌমিতা পরিবহনের চালক মামুন মিয়ার সাথে। তিনি বলেন, ‘কয়েকদিন আগেও ১১ হাজার টাকার মামলা দিসে রুট পারমিট নাই বইলা। মালিক চালাইতে কইলে আমার কি করার আছে? এই বাস হইসে নেতাফেতাগো। হেরা যা কয় আমরা তাই শুনি।’ বাস কেন আঁকাবাঁকা করে রাখা হয় এমন প্রশ্নে মামুনের উত্তর ‘আমি বাস ওমনে না রাখলে পিছে দিয়া আরেকটা আইয়া আমার যাত্রী তুইল্লা ফেলবো। এল্লিগা রাখি, জানি মাইনসে গাইল্লায়। কিন্তু যাত্রী না তুললে তো আমারই লস।’

মৌমিতা বাসের বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি মাহবুবুর রহমান মাসুম বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জের গণপরিবহনগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে একদল লোক। তাদের নিয়ন্ত্রণে মেয়াদোত্তীর্ণ গাড়িও চলে। জেলা প্রশাসক মৌমিতা পরিবহনকে বন্ধ করতে ব্যর্থ। মৌমিতা সাইনবোর্ড পর্যন্ত লাইসেন্স নিয়ে নারায়ণগঞ্জ শহরে চালাচ্ছে। এই মৌমিতা শহরে যানজট সৃষ্টি করার অন্যতম কারিগর। এসব নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব যার, সেই জেলা প্রশাসক কিছুই করছেন না।

এর আগে, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী মৌমিতার উপর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘এই শহরের বাসগুলোকে কেউ মামলা দিতে পারে না। স্বনামধন্য বাস মালিকদের বাসকে যদি কেউ মামলা দেয় তাহলে তাকে বিদায় হয়ে যেতে হবে। ওই টিআই ট্রান্সফার হয়ে যাবে। মৌমিতাকে মামলা দেয়া যাবে না। তারা চাষাঢ়ায় দাপিয়ে বেড়াবে। মৌমিতা সিদ্ধিরগঞ্জের কথা বলে চাষাঢ়ায় ঢুকেছে। এই মৌমিতাকে শহর থেকে বিতাড়িত করতে হবে। মৌমিতার বিরুদ্ধে আমাদের একত্রিত হতে হবে।’

প্রশাসনের ভূমিকা কি?

মৌমিতা প্রশ্নে বেশ চাপের মুখেই রয়েছে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসনের সাবেক প্রশাসক জসীম উদ্দিন নিজেও একবার মৌমিতার উপর ক্ষোভ প্রকাশ করে বক্তব্য দিয়েছিলেন। ২০২০ সালের ২২ অক্টোবর এক সভায় তিনি বলেন, ‘মেট্রোহল দিয়ে যখন আসি তখনই দেখি মৌমিতার ৩টি বাস দিয়ে আমার গাড়ি আটকে দিয়েছে। আমার সঙ্গে থাকা পুলিশ যখন রাস্তায় নামে তখন তাঁরা রাস্তা ছাড়ে। মনে মনে ভাবি নিজেই মারবো কিনা? পরে ভাবি জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হয়ে নিজে কিভাবে মারি? আমি যদি মারি তাহলে বিচার কে করবে? এটা ভেবে থেমে যাই।’ 

বার বার মৌমিতা বাসের বিরুদ্ধে নানান অভিযোগ উঠার প্রশ্নে জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, ‘মৌমিতাসহ অবৈধ যানবাহনের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’

তবে এসব অভিযান ততটা দৃশ্যমান না হলেও ডিসেম্বর মাসে চালানো জেলা প্রশাসনের অভিযান বলছে, ‘এক মাসে সড়ক পরিবহন আইনে ১২টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এর মধ্যে মামলা দায়ের হয়েছে ৪৭টি। আদায় হয়েছে ৮৫ হাজার ৬০০ টাকা।’ 

জেলা প্রশাসকের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মৌসুমী বাইন হীরা বলেন, ‘আমরা ধারবাহিকভাবে মৌমিতাসহ রুট পারমিটবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছি। মৌমিতাসহ একাধিক বাসের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়েছে। আমরা দেখতে চাই তাঁরা কতদিন এভাবে জরিমানা দিয়ে বাস চালাতে পারে। এই অভিযান আমরা অব্যাহত রাখবো।’

একই বিষয়ে জেলা বিআরটিএ’র সহকারী পরিচালক (ইঞ্জি) শামসুল কবীরের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ট্রেনিং এ আছেন বলে জানা যায়। পরবর্তীতে মুঠোফোনে একাধিকবার কল করলেও তিনি তা রিসিভ করেননি।

তবে বিআরটিএ’র অফিস সূত্র জানায়, ‘মৌমিতার বিরুদ্ধে চলমান বিভিন্ন অভিযানে জেলা প্রশাসনের সাথে বিআরটিএ যৌথভাবে অভিযান পরিচালনা করে থাকে।’

Islams Group
Islam's Group