News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা মঙ্গলবার, ০৬ ডিসেম্বর, ২০২২, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

মাদকের সহজলভ্যতায় বিপদগামী তরুণ প্রজন্ম


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | মাহবুব আলম প্রিয় (লেখক- সাংবাদিক ) প্রকাশিত: জুলাই ১৭, ২০২২, ০৯:৪৬ পিএম মাদকের সহজলভ্যতায় বিপদগামী তরুণ প্রজন্ম

'মাদক' ভয়ংকর ধ্বংস দানব। যার কবলে দেশের লাখ লাখ মানুষ।এদের মধ্যে কিশোর-কিশোরী ও তরুণ প্রজন্মের হার সবচেয়ে বেশি। এতে চরম হুমকীকে আগামী প্রজন্ম।  আজকের তরুনরা যেখানে প্রস্তুতি নেবে সুন্দর আগামী গড়তে সেখানে সহজলভ্য মাদকের নেশায় কিশোর গ্যাং গড়ে তুলে নেশায়বুদ হচ্ছে। হারাচ্ছে নীতি নৈতিকতার মানবিক সব গুন। সমজা কী ভাবছে এ নিয়ে? এমন ভাবনায় সমাজপতিরাও যেন অসহায়। তাই প্রশাসনের নানা উদ্যোগকে ব্যর্থ বললেও মন্দ হবে না। কারন তারা মাদকের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেনি স্বাধীনতার ৫০ বছরেও। অরক্ষিত আর অসাধু কর্মকর্তাদের যোগাযোগে নিত্য মাদক প্রবেশ করছে এ দেশে। ফলে হাত বাড়ালেই মিলছে মাদক।

মুলত মাদকদ্রব্য হলো এমন সব দ্রব্য যেগুলো মানুষকে নেশাগ্রস্ত করে তোলে। কেউ যখন মাদকদ্রব্যের প্রতি নেশাগ্রস্ত হয়ে যায়, তখনই তাকে মাদকাসক্ত বলা হয়। বর্তমানে গাঁজা, ফেনসিডিল, হেরোইন, মদ, কোকেন, এন ১০, ব্রাউন সুগার, কোরেক্স, মারিজুয়ানা, বারবিচুয়েট, ম্যানডেক্স, এলএসডি, ডিমটি, আইস, আফিম ইয়াবা ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য শহর, বন্দর, নগরী থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে অতি সহজলভ্য বস্তু। বর্তমানে মাদকসেবনের দ্বারা বিমূর্ত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হচ্ছে শারীরিক, মানসিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, পারিবারিক, নৈতিক মূল্যবোধ। মাদকের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ প্রভাবে সমাজ যেন আজ অবৈধ, অনৈতিক, অপরাধমূলক কর্মকান্ডের আঁতুড়ঘর।

ফলে  একটি জাতির সামাজিক, মানবিক মূল্যবোধ ধ্বংসের অন্যতম এই হাতিয়ার হয়েছে এ 'মাদক'। এর বিরুদ্ধে যথাসময়ে সঠিক পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন না করায়  ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে আগামী প্রজন্ম৷

মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, মাদক বৃদ্ধির জন্য দায়ী এর সহজলভ্যতা এবং জীবনের প্রতি হতাশা। ফলে সমাজে মাদকাসক্তি এবং অপরাধ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাছাড়া পারিবারিক সমস্যা, বন্ধু-বান্ধবের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে, বিনোদন অযুহাতে , কৌতূহলবশত, বা ভুল তথ্য থেকে তরুণ প্রজন্ম ক্রমেই মাদকের জালে জড়িয়ে যাচ্ছে।  এভাবেই জননিরাপত্তা আজ হতাশার  বাঁধভাঙা উল্লাসে মত্ত।

মাদকের সঙ্গে সম্পর্কিত সবার ভয়াবহ ক্ষতির কারণ। মাদক ক্ষতি করে আসক্তের, আসক্তের পরিবারের, সমাজের, দেশের।মাদক সেবনের বাস্তব প্রতিক্রিয়াস্বরূপ যেসব সমস্যা দেখা দেয়, তার মধ্যে রয়েছে শারীরিক বিভিন্ন রোগ-ব্যাধি। আর ঐ রোগ সারাতে চিকিৎসা ব্যয় এই ক্ষেত্রে পরিবারের অর্থনৈতিক এবং মানসিক চাপ সৃষ্টি করে, পারিবারিক অশান্তির সৃষ্টি হয়।  কর্মক্ষম জনশক্তি কমে যায়। শেখার ক্ষমতা এবং কাজের দক্ষতা কমে আসে। বিচার-বিবেচনা, ভুল ঠিক বোঝার ক্ষমতা হারিয়ে যায়।  সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।  আবেগ নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। মাদক সেবনে বাধা দিলে তারা হিংস্র আচরন করে৷ এমনকী খুন পর্যন্ত করে৷ অনেকের মাঝে আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা দেয়।  সুতরাং এতোসব শারীরিক,মানসিক ক্ষতির পর মাদককে কোন অযুহাতে ভদ্র সমাজে গ্রহণ করার কোনরূপ যুক্তি থাকার কথা নয়। তবু সহজলভ্যের তালিকায় এ মাদকের।

মানসিক বিকারগ্রস্ত হয়ে সম্প্রতি বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে মাদকাসক্ত হয় হাফিজুর নামের ছাত্র৷ ঢাকার ডিবি সূত্র জানায়, এরপর তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রশাসনিক ভবনের সামনে এসে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে এক ডাব বিক্রেতার দা কেড়ে নিয়ে নিজের গলায় চালিয়ে দেন। উক্ত ঘটনায় কতিপয় যুবককে পুলিশ গ্রেপ্তার করলে দেখা যায় গ্রেপ্তারের কারণে কোনো ভয় কিংবা প্রতিক্রিয়া তাদের অভিব্যক্তিতে ছিল না হাসিখুশি এই তরুণ দলকে দেখে হতবাক হয়েছিল জাতি।  গ্রেপ্তার হওয়ার পরও কেন আসক্ত তরুণরা ছিল প্রতিক্রিয়াহীন, নির্বিকার এবং হাসিখুশি!

মাদকাসক্তি সম্পর্কে জানতে চাইলে রূপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য  ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাক্তার আইভী ফেরদৌস জানান,   'মাদকাসক্তি ক্রাইম না, একটি স্বাস্থ্যগত অসুখ কিন্তু মাদকাসক্তরা মাদকের টাকা জোগাড় করতে ক্রাইমে জড়ায়'। সমাজ ও পরিবারের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এ ভয়ানক মাদক প্রতিরোধ সম্ভব।

তথ্যসূত্র মতে, মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশই অভিভাবকের অর্থে মাদক কেনে। ৫৬ দশমিক এক শতাংশ ব্যয় করে নিজের অর্থ। পরিবারের সম্পদ বিক্রি করে ২০ দশমিক ৭ শতাংশ। অন্যের টাকা চুরি করে ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ। আত্মীয়দের কাছ থেকে টাকা নিয়ে মাদক কেনে ১৪ দশমিক ২ শতাংশ ব্যক্তি। আবার, অর্থের জোগানে ভয়ংকর অপরাধেও জড়িয়ে পড়ে মাদকসেবীরা। মাদক সেবনকারীরা অর্থ জোগাড়ে অনেক সময় মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে যায়৷ শুধু তাই নয়। সময়ের আলোচিত দুশ্চিন্তার নাম কিশোর গ্যাং। কিশোরদের অপরাধ থাকলেও  আইনের আওতায় নিলে তা সংশোধনের  সুযোগ পায়। এ সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে একটি প্রভাবশালী মহল। তারা কিশোরদের ব্যবহার করে রাজনীতির মাঠ গরম, কিংবা নিজেদের অপরাধ রাজ্য পরিচালনা করছেন। কিশোরদের ব্যবহার করা হচ্ছে সৈনিক হিসেবে।  তাদের  কথিত আনন্দ দিতে বিনামুল্যে মাদক সেবনের সুযোগ দিচ্ছে শেল্টারদাতা মাফিয়া চক্র। কিশোরদের ব্যবহার করে মাদকের রাজ্যও পরিচালনা করছে তারা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদক হচ্ছে অপরাধের জনক। ধর্ষণ, হত্যা, ছিনতাই, রাহাজানিসহ যত ধরনের অপরাধ হয়-সবকিছুর মূলেই এই মাদক।

এটি সহজলভ্য হওয়ায় মাদক সেবনের পাশাপাশি নিজেরাই ব্যবসায়ী বনে যায়৷ পুলিশ সূত্র জানায়, পাইকারী মাদক কারবারিদের টার্গেট থাকে উঠতি বয়সি তরুণ-তরুণীরা।   ক্ষেত্রবিশেষে গোপন ভিডিও ধারণ করে তাদের বস্ন্যাকমেইল করে মাদকের চক্রে জড়িয়ে নেয় তারা৷ ফলে একবার প্রবেশ করলে আর এ ফাঁদ থেকে বেরুতে পারেনা তারা।

সূত্রমতে, যারা মাদকের সাথে জড়িয়ে যায়, তাদের আইনি ধরপাকর হলে সেখানে আইনজীবি নিয়োগ করা,জামিনে ছাড়ানো ও পরবর্তীতে নতুন কৌশলে মাদকে জড়িয়ে দেয়ার কাজ করে ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকা প্রভাবশালী মাদক কারবারিরা।  সমাজের ক্ষমতাসীন ও অসাদু পুলিশরা তাদের থেকে নিয়মিত বখরা পেয়ে সুযোগ করে দেয় সমাজ ধবংসের এমন অপকর্মে।

প্রশ্ন হলো, কতটুকু নিরাপদ আমাদের সীমান্ত নজরদারী। যেখানে আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করছে মাদক। আবার অনুমোদিত বারে যে কেউ সহজে মাদক ক্রয়ে যুক্ত হতে পারছে। বিয়ে,জন্মদিন, নানা উৎসবে আমন্ত্রিত মেহমানদের কোথাও কোথাও প্রকাশ্যে মাদক দিয়ে আপ্যায়নের চিত্র দেখা যায়। বিদেশী মাদকের পাশাপাশি দেশীয় বাংলা মদ বা চোলাই মদে নিন্ম আয়ের মাদকসেবীরাও বাদ পড়েনি নেশার খপ্পর থেকে। বাজারের পানির বোতল,কোমলপানীয়ের জারে করে বহন করছে প্রকাশ্যে। সড়ক মহাসড়কে পরিবহন সংশ্লিষ্ট মাদককারবারিরাও সক্রিয় রয়েছে। এমন দৃশ্য আইন শৃঙ্খলাবাহীনির কব্জায় চলমান আইনি ব্যবস্থা নিত্য ঘটনা। ভ্রাম্যমান আদালত বসিয়ে, সামাজিক প্রচার ও নানা উপায়ে মাদক নিয়ন্ত্রণের কর্মসূচি দেখা যায়। জেল, জড়িমানা, শাস্তির খবরও শুনি। কিন্তু আদৌ কী মাদকের ভয়াবহতা কমেছে? মোটেই না। পাড়া মহল্লা, পর্যটন অঞ্চল,  অলি গলিতে চিহ্নিত মাদক কারবারিরা দেদারছে বিক্রি করছে মাদক। এমনকী পুলিশ সোর্সের কাজ করা ব্যক্তিরাও মাদকের সাথে জড়িয়ে যায়৷ তাদের নিয়মিত মাসোহারা দিয়ে বহাল রাখে এ অপবাণিজ্যিক যাত্রা।

তবু আশাবাদী আমরা। সমাজ তার অবস্থানে কঠোর হবেন। সম্মিলিত উদ্যোগে প্রশাসনের দায়িত্বশীল আচরনে মাদকমুক্ত সমাজ গড়ে তুলবেন এটাই প্রত্যাশা৷

Islams Group
Islam's Group