News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা মঙ্গলবার, ০৬ ডিসেম্বর, ২০২২, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

সরকারী হাসপাতালের একসঙ্গে ১৮ জনের চাকরিচ্যুতে ধোঁয়াশা


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট প্রকাশিত: নভেম্বর ২১, ২০২২, ১১:১১ পিএম সরকারী হাসপাতালের একসঙ্গে ১৮ জনের চাকরিচ্যুতে ধোঁয়াশা

ঘুষ না দেওয়ায় নারায়ণগঞ্জ জেলা সিভিল সার্জনের অধীনে সরকারী হাসপাতালগুলোর ১৮ জন কর্মচারীকে একসঙ্গে চাকরিচ্যুত করার অভিযোগ উঠেছে নারায়ণগঞ্জ জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের হিসাবরক্ষক মো. নূরে আলমের বিরুদ্ধে। তাদের অভিযোগ, চাকরি রিনিউয়ের নামে তিনি বিভিন্ন সময় টাকা দাবী করে থাকেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ওই টাকা না দিলে তার চাকরি থাকে না। তবে মো. নূরে আলমের দাবী, চাকরি দেওয়ার কিংবা নেওয়ার ক্ষমতা তার নেই। সরকারী হাসপাতালগুলোতে টেন্ডারের মাধ্যমে ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হয়। ঠিকাদাররা হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় জনবল দিয়ে থাকেন। অপরদিকে চাকরিচ্যুতদের বিরুদ্ধে দালালীসহ নানা অভিযোগ থাকার কথা বলছে নারায়ণগঞ্জ জেলা সিভিল সার্জন। তার দাবী, সরকারি হাসপাতালগুলোতে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ হয়। তারা শুধু ঠিকাদার নিয়োগ দিয়ে থাকেন। ঠিকাদাররা আমাদের লোকের তালিকা দেয়। তখন আমরা তাদের একটা মৌখিক পরীক্ষা নিয়ে যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের নিয়োগ দিয়ে থাকি।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চাকরিচ্যুত ১৮ জন প্রিমা এসোসিয়েটস লিমিটেডের অধীনে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে হাসপাতালগুলোতে কাজ করতেন। করোনার সময় তারা বিনা বেতনে রোগীদের সেবা দিয়ে আসছিল। এখনো তাদের অধিকাংশরই অনেক মাসের বেতন পাওনা রয়েছে। এ অবস্থায় তাদের চাকরিচ্যুত করার কারণে তারা প্রত্যেকেই তাদের পরিবার নিয়ে অনেক দুর্দশার মধ্যে জীবন অতিবাহিত করছেন। তাদের দাবি, তাদের চাকরি রিনিউ করার সময় নারায়ণগঞ্জ জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের হিসাবরক্ষক মো. নূরে আলমকে মোটা অঙ্কের অর্থ প্রদান করতে হয়। অর্থ না দিলেই তিনি তাদেরকে নানা অজুহাতে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেন। এ মুহূর্তে তারা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ কামনা করছেন। চাকরি না থাকায় সুইসাইড ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় নেই এখন।

চাকরিচ্যুত ওই ১৮ জন হলেন বন্দর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ওয়ার্ডবয় মো. রবিউল ইসলাম, পরিচ্ছন্নকর্মী রিদম আহমেদ, ওটিবয় মাসুদ, নারায়ণগঞ্জ ভিক্টোরিয়া হাসপাতালের পরিচ্ছন্নকর্মী মো.রাজু, সোনারগাঁ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ল্যাবরেটরী সুমি আক্তার, বন্দর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ওটিবয় উজ্জ্বল, নারায়ণগঞ্জ ভিক্টোরিয়া হাসপাতালের ওয়ার্ডবয় বিটন দত্ত, আড়াইহাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ওয়ার্ডবয় শাকিল মিয়া , নারায়ণগঞ্জ ভিক্টোরিয়া হাসপাতালের আয়া এআর ইয়াসমীন, সোনারগাঁ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পরিচ্ছন্নকর্মী রুবেল, সোনারগাঁ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ওটিবয়  হাসান, নারায়ণগঞ্জ ভিক্টোরিয়া হাসপাতালের পরিচ্ছন্নকর্মী দ্বীন ইসলাম, আয়া পারভীন, পরিচ্ছন্নকর্মী সালাম, নিরাপত্তাপ্রহরী তুফান, নিরাপত্তাপ্রহরী সাইফুল, ওয়ার্ডবয় আবু রায়হান ও আড়াইহাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মালী আখলিমা।

মো. রবিউল ইসলাম। ৫ বছর ধরে বন্দর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ওয়ার্ডবয়ের কাজ করেন। তিনি এ প্রদিবেদককে বলেন, আমাদের প্রতিবছরে একটা করে রিনিউ করতে হয়। নারায়ণগঞ্জ সিভিল সার্জনের হিসাবরক্ষক মো. নূরে আলম রিনিউয়ের নাম করে আমাদের কাছ থেকে প্রচুর অর্থ দাবি করে। এ বছর টাকা দিতে না পারায় আমাকে চাকরিচ্যুত করে। আমি ৫ বছর না খেয়ে অনেক কষ্ট করে এই চাকরি করে গিয়েছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিকট আমার আকুল আবেদন আমাদের এই দুর্নীতিবাজ লোকদের হাত থেকে রক্ষা করুন। করোনাকালীন সময়ে আমি দীর্ঘদিন কষ্ট করে বন্দর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মানুষের সেবা করে গিয়েছি। আমি এখনো ৮ মাসের বেতন পাইনি। আমি গরিব অসহায় লোক, আমার বাবা নেই। আমার ভাই রিকশা চালায়। গত ১৮ নভেম্বর হিসাবরক্ষক মো. নূরে আলম আমাকে ফোন দিয়ে বলে, তুমি ২ লক্ষ টাকা দিলে তোমার চাকরি থাকবে না। আমি টাকা দিতে না পারায় বিনা নোটিশে আমাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। আমার পরিবর্তে ২-৩ লক্ষ টাকার বিনিময়ে অন্য লোককে নেওয়া হয়েছে। তিনি গতবার আমার কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা নিয়েছিল। এইবার আরো বেশি টাকা দাবি করায় আমি এই টাকা দিতে পারি নাই।

ইয়াসমিন আক্তার নামে আরেক ভুক্তবোগী জানান, ৫ বছর ধরে নারায়ণগঞ্জ ভিক্টোরিয়া হাসপাতালে তিনি আয়া পদে কর্মরত ছিলেন। আমাদের ২ বছর, ১ বছর কিংবা ৬ মাস পর পর চাকুরি রিনিউ করতে হয়।  এইবার আমার ৬ মাসের জন্য চাকরি রিনিউ করার কথা ছিল। সিভিল সার্জন কার্যালয়ের হিসাবরক্ষক নূরে আলম ৬ মাসের জন্য নতুনদের কাছ থেকে দুই লক্ষ টাকা নিয়েছে। আমরা এই টাকা দিতে পারছি না। আমরা বিগত ৯ মাস ধরে বেতনই পাচ্ছি না। আমরা এতো টাকা কোথায় থেকে পাবো? ধার দেনা করে নিজের সংসার চালাচ্ছি, বাচ্চার খাবারের জোগান করছি। আমাদের দ্বারা আর সম্ভব না। তারপরও আমি নূরে আলম স্যারের কাছে ৫০ হাজার টাকা নিয়ে গিয়েছিলাম। তিনি আমাকে বলে দিয়েছেন আমার চাকরি নাকি হবে না।

কান্নাজড়িত কন্ঠে তিনি বলেন, এখন আমি দুই লক্ষ, তিন লক্ষ টাকা জোগাড় করবো কোথায় থেকে? আমার স্বামীর ভালো উপার্জন থাকলে তো আমি এই চাকরি করতাম না। আমার এখন সংসার চালাতে, বাচ্চা চালাতে অনেক কষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তারপরও আমি স্যারদের হাতে পায়ে পড়ে অনেক কাকুতি মিনতি করেছি। তারা শুধু বলেন, ওয়েটিংয়ে থাকো। আর কতো ওয়েটিংয়ে থাকলে এর সমাধানটা আসবো। এখন আমি আর কার কাছে কর্জ করমু? ওইরকম পরিস্থিতি এখন আর নাই। করোনার সময় আমার কোনো বেতন ছিল তবুও আমি রূপগঞ্জ থেকে ভিক্টোরিয়া হাসপাতালে কষ্ট করে আসছি। আমার দৈনিক ২০০ টাকা করে ভাড়া লাগতো। আমি তিন লক্ষ টাকা দিতে পারি নাই বলে আমার চাকরিটা নাই। নতুনদের কাছে বেশি টাকা পাচ্ছে তাই তাদেরকে চাকরিতে নিচ্ছে আর পুরানোদের চাকরিচ্যুত করছে। প্রতিনিয়ত তারা বলে তোমরা তিনটা মাস ভালো করে কাজ করো তাহলে তোমাদের নেওয়া হবে। কিন্তু তারপরও দেখি টেন্ডার ওনারা পাওয়ার পর নূরে আলম স্যারের মতো অনেকেই আছে যারা বলেন, এখন তিন লক্ষ টাকা না দিলে চাকরি হবে না। তাহলে কেনো আমাদের মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে  দুই মাস, তিন মাস মাগনা খাটায়? এই বিষয়টা নিয়ে আমরা সিভিল সার্জনের কাছে কয়েকবার গেলে তিনি বারবার বলেন, দেখছি। কিন্তু এই দেখতে দেখতে আমিসহ ১৮ জনকে বাদ দিয়ে দিছে। আমার দুধের শিশুরে নিয়ে এখন কোথায় যাবো? মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাদের দিকে তাকাচ্ছেন না। আমরা এখন কি করবো, কিভাবে চলবো? আমাদের এখন আশার কোনো পথই নাই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমার দিকে না তাকালে সুইসাইড ছাড়া আমার আর কিছু করার নাই। বারবার এমন টেন্ডার হবে বারবার আমি টাকা কোথায় থেকে দিবো।

একই অভিযোগ করেন সুমি আক্তার। তিনি সাড়ে ২ বছর ধরে সোনারগাঁ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ল্যাবরেটরীতে কাজ করতেন। ওইখানে চাকরি করা অবস্থায় তিনি ৮ মাস বেতন পান নি। তারপরও আমি চাকরি চালিয়ে যাচ্ছিলাম। ৪ দিন আগে আমি অফিসে গিয়ে জানতে পারি অফিসে নতুন লোক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আমাকে কেনো বাদ দিলো তা আমি জানতে পারি নাই। কিন্তু আমি জানতে পারছি যে আমার জায়গায় নতুন এক লোক সাড়ে ২ লক্ষ টাকা দিয়ে নিয়োগ দিয়েছেন।

শাকিল মিয়া আড়াইহাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ওয়ার্ডবয়ের কাজ করছেন। তার ৮ মাসের বকেয়া বেতন বাকী। আজ আমি জানতে পারলাম আমার চাকরি নেই। তারপর আমি সিভিল সার্জনের কাছে গিয়ে কোনো সুফল পাইনি। তখন আমি জানতে পারলাম যে এখানে হিসাবরক্ষক নূরে আলম অনেকের কাছ থেকে টাকা চেয়েছে। আমার কাছেও সে টাকা চেয়েছিল কিন্তু আমি সময়মতো আমি টাকা দিতে পারে নি। আমার জায়গায় সে দুই লক্ষ টাকা খেয়ে নতুন জালাল নামের একজনকে চাকরি দিয়েছেন।

নারায়ণগঞ্জ জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের হিসাবরক্ষক নূরে আলম জানান, পিমা এসোসিয়েটস লোক নিয়োগ দিবে। আমরা টেন্ডারের মাধ্যমে ঠিকাদার নিয়োগ দেই পিমা এসোসিয়েটসকে। পিমা এসোসিয়েটস কাদেরকে নিয়োগ দিবে? তাদেরকে কীভাবে দিবে? এটা পিমা বলতে পারবে। এখানে আমাদের দেওয়ার ক্ষমতা নাই। আমি করো কাছে রিনিউয়ের নামে টাকা দাবি করি নাই। আমি টাকা দিয়ে কি করুম? এগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা।

পিমা এসোসিয়েটস লিমিটেডের পরিচালক বাকের হোসেন বলেন, টাকার জন্য না বিভিন্ন কাজকর্মে তাদের ত্রুটি থাকায় চাকুরিচ্যুত করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আছে কিনা তা হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ ভালো বলতে পারবে। হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ আমাকে শুধু বলেছে আপনাদের এই কয়জন লোককে পরিবর্তন করতে হবে। হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ যে কয়জন লোককে পরিবর্তন করতে বলে আমাদের সে কয়জন লোককেই পরিবর্তন করতে হয়। ওনারা আমাদের কাছে ভালো সার্ভিস চায়। তারা এখন অনিয়ম পেয়েছে। তাই আমাকে বলেছে এই কয়জন লোককে পরিবর্তন করতে হবে। এখানে তথাকথিত কোনো অনিয়ম হয় নাই।

নারায়ণগঞ্জ জেলা সিভিল সার্জন ডা. মশিউর রহমান বলেন, নূরে আলম চাকরি দিবে কোথায় থেকে? নূরে আলমের কাছে কোনো চাকরি আছে? সরকারি হাসপাতালগুলোতে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ হয়। আমরা ঠিকাদার নিয়োগ দেই। ঠিকাদার লোক নিয়োগ দেয়। ঠিকাদার আমাদের লোকের তালিকা দেয়। তখন আমরা তাদের একটা মৌখিক পরীক্ষা নিয়ে যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের নিয়োগ দিয়ে থাকি। এখানে সম্পূর্ণ ঠিকাদারের কাজ। নূরে আলমের এখানে কোনো ভূমিকা নাই। সে তো অফিসিয়াল কাজ করে। একজন হিসাবরক্ষকই যদি এতো লোক নিয়োগ দিতে পারতো। তাহলে আমার কি অবস্থা হতো? আমি সিভিল সার্জন হয়ে একটা লোকও নিয়োগ দিতে পারলাম না। আর নূরে আলম ১৮ জনের চাকরিচ্যুত করে দিলো। চাকরিচ্যুতদের অনেকেই হাসপাতালে পুরনো ছিল যারা হাসপাতালে দালালীর কাজে যুক্ত ছিল। অফিসাররা তাদের বিরুদ্ধে সুপারিশ করেছিল পুরনো ঠিকাদারদের কাছে। যেনো তাদেরকে হাসপাতালগুলোতে না রাখা হয়। আর ঠিকাদারই এই সম্পূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আর কেউ ব্যক্তিগতভাবে যদি লেনদেন করে থাকে তাহলে এর প্রমাণ পেলে আমরা আইনানুগ ব্যবস্থা নিবো।

Islams Group
Islam's Group