News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা সোমবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০২৩, ১৬ মাঘ ১৪২৯

২০০ বছরের পুরনো কাইকারটেক হাট


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট প্রকাশিত: ডিসেম্বর ৩, ২০২২, ১০:১৪ পিএম ২০০ বছরের পুরনো কাইকারটেক হাট

ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে প্রায় ২০০ বছরের বেশি সময় ধরে চলে আসছে কাইকারটেক হাট। হাটের বিভিন্ন প্রাচীন নিদর্শন ও পাতা ঝড়া কড়ই গাছগুলো যেনো হাটের বয়সকালের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কাইকারটেক হাট নিয়ে লোকমুখে প্রচলিত রয়েছে, এক সময় এখানে হাতি-ঘোড়া বেচাকেনা হতো। এছাড়া রাজা-বাদশাহদের আনাগোনাও নাকি ছিল এই হাটে। গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যকে ধারণ করে রয়েছে ২০০ বছরের পুরনো এই কাইকারটেক হাট। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের মোগরাপাড়া ইউনিয়নে কাইকারটেক এলাকায় দেখা মিলবে ঐতিহ্যবাহী এই হাটের।

বাংলাদেশে প্রতিটি হাট একটি প্রথাগত নিয়ম মেনে চলে। সোনারগাঁ এর ঐতিহ্যবাহী ‘কাইকারটেক হাট’ রীতিমতো একই নিয়ম মেনে চলে। সপ্তাহের রবিবারে সকাল ৬টা হতে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত দেখা মিলবে এ হাটের। শুধু রবিবারেই এই হাট বসে থাকে তাই এই হাটটিকে স্থানীয়রা রবিবারের হাট বলে থাকে। ঐতিহ্যবাহী এ হাটকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন জেলা থেকে ক্রেতাদের আনাগোনা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। সকাল থেকেই এই হাট প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর হয়ে উঠে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় সকল বস্তু পাওয়া যায় এ হাটে। হাটে প্রবেশ করলে প্রথমেই দেখা মিলবে সকলে উৎসবমুখর পরিবেশে বেচাকেনায় ব্যস্ত। হাটে পাওয়া যাবে মাছ ধরার বিভিন্ন সামগ্রী যেমন- জাল, বড়শি, টেটা ইত্যাদি। এছাড়াও রয়েছে শাক-সবজি, খাল ও নদীর মাছ, মশলা, গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি, কবুতর, কাস্তে, দা, বঁটি, কুড়াল, জামা-কাপড়, কলমের গাছ, বাঁশ, কাঠসহ নিত্য ব্যবহার্য নানান কিছু। ফলের মৌসুমে এখানে আম, জাম, কাঠালসহ নানা রকমের ফল ও আসবাবপত্র বানানোর নানা রকমের উপকরণ হাটে ওঠে। হাটে এলে মনে হবে কি নেই এই হাটে?

এই হাটের প্রধান আকর্ষণ হচ্ছে পুতা মিষ্টি নামে এক প্রকার ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি। অনেকেই এই মিষ্টিকে শিলপুতাও বলে থাকেন।

মিজানুর রহমান নামে এক মিষ্টি বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এক একেকটি মিষ্টি আধা কেজি থেকে এক কেজি হয়ে থাকে। কেউ চাইলে অর্ডার করে আরো বেশি ওজনের মিষ্টি বানিয়ে নিতে পারবেন। প্রতি কেজি মিষ্টির মূল্য ২০০ টাকা। এছাড়াও তার দোকানে বিভিন্ন রকমের মিষ্টি, রুটি, ডাল-ভাজি বিক্রি হয়ে থাকে।

তিনি জানান, দূরদূরান্ত থেকে অনেক মানুষ আসেন এই বিখ্যাত পুতা মিষ্টি খেতে। অনেকে আবার পরিবারের জন্য মিষ্টি কিনে নিয়ে যান।

পুতা মিষ্টি ছাড়াও এখানে তালের রসা, কালোজাম, রসগোল্লা, জিলাপি, মোহনভাগ, লালভোগ, বালুসাই, দই, পরোটা-ভাজি, ডালসহ নানা পদ পাওয়া যায়। এছাড়া ঝালমুড়ি, মুরালি, বুট, পেঁয়াজু, নিমকি, চানাচুর, মোয়াসহ নানা ধরনের লোকজ খাবার। এছাড়া নানান পদের মাছের শুটকিও এখানে পাওয়া যায়।

সালাম মিয়া নামের এক বাঁশ বিক্রেতা জানান, ময়মনসিংহ থেকে বাঁশ নৌ-পথে এখানে আসে। সোনারগাঁ, চেঙ্গারচর, মুন্সীগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলা থেকে ক্রেতাগণ এখানে আসেন। বর্ষার মৌসুমের শেষ দিকে তাদের বাঁশের কেনাবেচা ভালো হয়। এসময় মানুষ সাঁকো, পাড় বাঁধার কাজসহ অন্যান্য কাজে ব্যবহার করার জন্য বাঁশ কিনে থাকেন।

কথা হয় ৮১ বছর বয়সী শরবত বিক্রেতা মজিবুর রহমানের সঙ্গে। তিনি জানান, এই কাইকারটেক হাটটি পাকিস্তান আমল থেকে চলে আসছে। তিনি এই হাটে ৬৫ বছর ধরে শরবত বিক্রি করে আসছেন। তার বয়স হয়ে যাওয়ায় তার ভাগিনা আশরাফ উদ্দীন তাকে সঙ্গ দিয়ে থাকেন। তার সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, তার দোকানে আখের গুড়, লেবু ও বরফের মাধ্যমে সুমিষ্টি শরবত তৈরি করা হয়ে থাকে। তাদের দোকানের শরবতের নামডাক দীর্ঘদিনের। দূরদূরান্ত যারাই এই হাটে বাজার করতে আসে তারা এই দোকানের শরবত না খেয়ে যান না।

আব্দুর রহমান নামের কাইকারটেক হাটের এক কাঠ বিক্রেতা জানান, তিনি প্রায় ৪০ বছর যাবৎ এখানে কাঠ বিক্রি করেন। বর্তমানে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা আগের মতো নেই। যার কারণে তার কাঠের ব্যবসা এখন খারাপ যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে এই পেশার সঙ্গে তিনি যুক্ত তাই এই পেশা ছেড়েও দিতে পারছেন না।

কয়েকজন ক্রেতার সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, এই হাটটিতে সব জিনিসপত্রগুলো পাইকারী দামে পাওয়া যায়। আর এখানে এমন কোনো জিনিস নেই যে পাওয়া যায় না। আবার অনেক ব্যবসায়ী এখান থেকে জিনিসপত্র ক্রয় করে তাদের দোকানে বিক্রি করেন।

যেভাবে যাবেন : ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সোনারগাঁয়ের মোগরাপাড়া চৌরাস্তায় নেমে যেকোনো সিএনজিযোগে কাইকারটেক হাটে যাওয়া যায়। এছাড়া নারায়ণগঞ্জ জেলা শহরের চাষাঢ়া থেকে নবীগঞ্জ ঘাট পার হয়েও কাইকারটেক হাটে যাওয়া যায়। আর মুন্সিগঞ্জ থেকে নৌ-রুটে ট্রলার বা বোট ভাড়া করে সরাসরি পৌঁছাতে পারবেন ঐতিহ্যবাহী এ হাটে। হাটের মজার খাবারগুলোর স্বাদ, নানা লোকজ ঐতিহ্য ও প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য এবং সহজ-সরল গ্রামীণ জীবন যাপনের মুগ্ধতা নিতে চাইলে আপনাকে আসতে হবে ২০০ বছরের পুরনো এই হাটটিতে।

Islams Group
Islam's Group