News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা সোমবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০২৩, ১৬ মাঘ ১৪২৯

সারাজীবন সাক্ষাতকারই দিলাম, কিছু পাইলাম না


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট প্রকাশিত: নভেম্বর ২৯, ২০২২, ১০:০৯ পিএম সারাজীবন সাক্ষাতকারই দিলাম, কিছু পাইলাম না

‘সারাজীবন সাক্ষাতকারই দিলাম, কিছু পাইলাম না।’ নারায়ণগঞ্জের সদর উপজেলার বক্তাবলী ইউনিয়নে ১৯৭১ সালের ২৯ নভেম্বর সংঘটিত পাক বাহিনীর গণহত্যার মুখোমুখী হয়েও বেঁচে ফেরা মজিবর রহমানের সাথে কথা বলতে গেলে এভাবেই আক্ষেপ করে মন্তব্য করেন। বাড়ির পাশে চায়ের দোকান থেকে হেঁটে নিজ বাড়ির উঠানে বসে ধীরে ধীরে খুলে ধরেন তার অভিজ্ঞতার ঝুলি।

‘সেদিন সকালে ছিল প্রচ- কুয়াশা। সকাল ৭টায় উঠে মা’য়ের কাছে শুনি মিলিটারি নাকি আসছে। অত গুরুত্ব দেই নাই। তখন কাজ করতাম পাটকলে। টিফিন ক্যারিয়ারে খাবার নিয়া বাইর হইতেই দেখি আমার বইন রামনগর থিকা আইসা পড়ছে। কইতাসে মিলিটারি আইসে, আর থাকা যাইবো না। যখন বুঝলাম অবস্থা ভালা না তখন আর যাই নাই পাটকলে। ৯টার দিকে আমার আব্বা আর আমি বাদে সবাইরে কালিনগরের দিকে পাঠায়া দিলাম।’ বলছিলেন ১৯৭১ সালের ২৩ বছরের যুবক মজিবর।

১১টার দিকে বাইর হইসিলাম ঘরের বাইরে। দেখি দূর থিকা (থেকে) কয়েকটা পোলারে ধইরা মারতে মারতে নদীর পাড়ে নিতাছে মিলিটারি। আমারে ধইরা কইলো আয়। নাম জিগাইলো, কইলাম। মুক্তিগো চিনি নাকি? কইলাম চিনি না। লুঙ্গি চেক কইরা সিগারেটের প্যাকেট, ম্যাচ আর ১৭ টাকা নিয়া নিলো। তারপর নদীর পাড়ে নিয়া বসায়া রাখলো।

ওই পাক বাহিনী ১টা মুক্তিযোদ্ধারে পাইছিল। তারে ইচ্ছামত মারলো, রাইফেল দিয়া খোঁচাইলো। আছরের আযানের পর ওরা আমাগো সবাইরে বুক মাটিতে দিয়া শোয়াইলো। আমি একনজরে গুইনা দেখলাম ৩৯ জন জিন্দা আছি। ওয়্যারলেসে কথা কইতাছিল আর আমি শুনলাম ওরা কইতাসে, এইগুলারে কি করমু? ওই পাশ থিকা হিন্দিতে কইলো খতম কইরা দিতে। আমি খতম শব্দ বুঝছি তখনই। আমাগো লগেই ২ জন মাতবর ছিল। উনারাও শুইনা কইতে লাগলো ‘সবাই কলেমা পইরা নেও, আজকেই আমাগো শেষ দিন’।

এরপর ওরা ২ জন কইরা উঠায়া নিতাছে আর বলে চল তোগোরে বাইত দিয়া আসি। তারপর দুইজনরে একসাথে ঢিবিতে দাঁড় করায়া ১টা কইরা গুলি করে। ঐটাই দুইজনের শরীলে লাইগা গর্তে পইরা যায়। আমি একবার মাথা উঠায়া দেখলাম আমার সিরিয়াল ১৪ জনের পরে। মাথা উঠানোয় আমার কোমড়ে বেয়নেট দিয়া পার গুতা মারলো দিলো আর বুট চাইপ্পা পিঠ নামায়া দিলো। এরপর আমারে যখন দাঁড় করাইলো আমি তখন ভাবলাম, মরমু তো এমনিতেই। খাড়াইলেও মরমু, দৌঁড়াইলেও মরমু। তার চাইতে একটা দৌঁড় দেই, যা থাকে কপালে। এইটা ভাইবাই দিলাম এক দৌঁড়। দৌঁড়াইতে দৌঁড়াইতে আরেক রাস্তায় উঠতে গিয়ে পইরা গেলাম। ঘুইরা তাকায়া দেখি ওরা আর পিছে পিছে আসে নাই। পরে শুনছি আমি পলানোর পরে বাকি সবাইরে বেয়নেট দিয়া খোঁচাইয়া মারছে, যাতে আমার মত আর কেউ পলাইতে না পারে।

শুধু কি আপনিই বেঁচে ফিরতে পেরেছিলেন সেখান থেকে এমন প্রশ্নের জবাবে বলেন, আমার আগে মধ্যনগর গ্রামের ২ ভাইরে একলগে গুলি মারছিল। দুই ভাইয়ের মধ্যে একজনের গুলি লাগলেও ওই গুলি বাইর হইয়া পিছের জনের গাঁয়ে আর লাগে নাই। পিছের ভাইটা গর্তে পইরা মরার মত থাইকা বাইচা গেসিলো। ওর নাম হইলো মহাব্বর আলী, তয় বছর ৪ আগে শুনছি ওয় মইরা গেসে।

মজিবর রহমান আক্ষেপ করে বলেন, এখন আমার বয়স ৭৫। আমার অসুখের শেষ নাই। খালি যুদ্ধ শেষে ৫০০ টাকা পাইসিলাম, ওই পর্যন্তই। এরপর আর কেউ কিছু দেয় নাই। পোলাটায় ইটভাটায় কাজ কইরা নিজেই চলতে পারে না। তাও কোনমতে আছি। বহু মানুষরে আমার কথা কইসি। কেউ ফিরা তাকাইলো না। ২৯ নভেম্বর আইলে সবাই একটু খোঁজ নেয়। তারপরে সব আগের মত।

Islams Group
Islam's Group