News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২২, ১৪ আশ্বিন ১৪২৯

একজন চন্দন শীল : অদম্য চেতনায় উদ্ভাসিত সাহসের বাতিঘর


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | স্টাফ করেসপন্ডেন্ট প্রকাশিত: আগস্ট ২৫, ২০২২, ০৯:২২ পিএম একজন চন্দন শীল : অদম্য চেতনায় উদ্ভাসিত সাহসের বাতিঘর

নারায়ণগঞ্জের এ প্রান্ত থেকে অপরপ্রান্তে তিনি পরিচিত ‘চন্দন দা’ নামে। স্বাধীনতা, বঙ্গবন্ধু, আওয়ামীলীগ আর শেখ হাসিনার প্রশ্নে আপোসহীন এই মানুষটি যেন নিজের অদম্য ইচ্ছা শক্তি আর প্রেরণার উদাহরণে নিজেই পরিণত হয়েছেন একটি প্রতিষ্ঠানে। ২০০১’এর ১৬ জুন জঙ্গীদের আরডিএক্স আর স্পিন্টার তার দুটি পা কেড়ে নিতে পারলেও নিতে পারেনি তার আদর্শ, তার সততা, শেখ হাসিনার প্রতি মাতৃমায়া আর দলের প্রতি ভালোবাসা। উন্নত চিকিৎসার জন্য জার্মানীতে গিয়ে পেয়েছিলেন সেখানকার নাগরিকত্ব, বাড়ী। কাটিয়ে দিতে পারতেন বিলাসী জীবন। কিন্তু সেই জার্মানীর নাগরিকত্ব ছেড়ে বিএনপি-জামাত জোটের আমলেই দুই পা হারানো চন্দন শীল ফিরে এসেছিলেন দেশের মাটিতে। চিরপঙ্গু চন্দন শীলকেও ছাড় দেয়নি বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাসীরা। হামলা-মামলার শিকার হয়েও হাল ছাড়েননি। দল গোছাতে, হামলা-মামলায় পর্যদুস্থ শেখ হাসিনার সৈনিকদের এক করতে স্ক্র্যাচে ভর করেই ছুটে বেড়িয়েছেন এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে। কখনও জ্বালাময়ী ভাষন, কখনও ‘তীর হারা এই ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দেব রে’ গানের মূর্ছনায় ফিরিয়ে এনেছেন কর্মীদের সাহস ভরসা উদ্যম। যাপিত জীবনে তিনি আর একমাত্র ছেলে উপার্জনের জন্য কাজ করেন ইন্সুরেন্স কোম্পানীতে। তার স্ত্রী নিজেও একজন মানুষ গড়ার কারিগর, করেন শিক্ষকতা। আপদমস্তক সৎ আর দলপ্রেমী এই মানুষটির কাছে সাহস আর উদ্যমের উৎস খুজেছি আমরা।

প্রশ্ন:- আপনার পরিবারের ব্যাকগ্রাউন্ড জানতে চাই।

চন্দন শীল : আমার প্রয়াত বাবা রাজেন্দ্র নারায়ণ শীল ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার। মা রানী বালা শীল ছিলেন আদর্শ গৃহিণী। আমার স্ত্রী সুতপা শীল রমা পেশায় একজন শিক্ষক। একমাত্র সন্তান অরিজিৎ শীল মণ্টি শিক্ষায় সর্বোচ্চ ডিগ্রী নিয়ে আমার সাথে একটি বেসরকারি ইনস্যুরেন্স কোম্পানীতে চাকুরী করছে। আমার শ্বশুর পরেশ গুপ্ত ছিলেন প্রকৌশলী। কাকা শ্বশুর প্রখ্যাত সাংবাদিক সন্তোষ গুপ্ত, ছিলেন বঙ্গবন্ধু পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক। জ্যাঠা শ্বশুর বিপ্লবী রবি নিয়োগী ছিলেন বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের অগ্রপথিক।  আন্দোলন করতে গিয়ে গ্রেপ্তার হয়ে আন্দামানে জেল খেটেছেন।

প্রশ্ন : রাজনীতির শুরুটা হয়েছিল কিভাবে?

চন্দন শীল : মূলত আমি ও আমার সাথের বন্ধুরা যারা রাজনীতিতে এসেছিলাম ৭৫ এ বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ করতে গিয়ে। আমি নারায়ণগঞ্জ হাইস্কুলের ছাত্র ছিলাম, কিছুদিন নারায়ণগঞ্জ বার একাডেমীতেও পড়ালেখা করেছি। বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যার পর আমার বন্ধু শামীম ওসমানের নেতৃত্বে নারায়ণগঞ্জের রাজপথে আন্দোলনে নেমে ছিলাম। এরপর সরকারি তোলারাম কলেজে ছাত্রলীগের রাজনীতি করেছি। এই কলেজ থেকেই সম্পন্ন করেছি গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রী। তবে আমাদের মনে একটাই বাসনা ছিল, রাজনীতির একমাত্র অভিষ্ট লক্ষ্য ছিল বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার। তোলারাম কলেজে থাকতে শামীম ওসমানের নেতৃত্বে রাজাকার শাহ আজিজকে আমরা প্রবেশ করতে দেইনি। বঙ্গবন্ধুর খুনী জিয়াউর রহমানের গাড়ী আটকে দেয়ার সময়ও ছিলাম। ৭৯’র নির্বাচনে পুলিশি নির্যাতনের শিকার হয়েছি। জননেত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফেরার পর রাজপথ থেকে আর পিছনে ফিরে তাকাইনি। ৯০’র স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে ছিলাম। আসলে ৭৮থেকে ৯০পর্যন্ত রাজনীতির সেই ক্রান্তি যুগে আমি ও আমার সহযোদ্ধাদের বহু স্মৃতি আজও মনে করলে রক্তে শিহরণ জাগায়। এরপর ২২বছর পর জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় আসে। ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০১ পর্যন্ত আলোচিত সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের একান্ত সচিবের দায়িত্ব পালন করেছি, পাশাপাশি জেলা কৃষকলীগের সাধারন সম্পাদক ছিলাম।

প্রশ্ন : পরের ইতিহাসটা ?

চন্দন শীল : আসলে পরের ইতিহাসটা সবারই জানা। দেশের ইতিহাসের বর্বোরচিত এক ইতিহাসের স্বাক্ষ্য বহন করে চলেছি, চলবো আমৃত্যু। ২০০১ সালে চাষাঢ়া আওয়ামী লীগ অফিসে শামীম ওসমানকে হত্যার উদ্দেশ্যে বর্বরোচিত বোমা হামলায় দুটি পা হারিয়েছিলাম। সেদিন  মনের জোরে বেঁচে গিয়েছিলাম। আমার এখনও মনে পরে আমাদের বহনকারী শীতল গাড়ির ড্রাইভারকে বলেছিলাম রক্তক্ষরণ বেশী হচ্ছে গাড়ি যেন দ্রুত চালিয়ে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। হাসপাতালে সংকটাপন্ন অবস্থায় থেকেও স্ত্রী রমার কাছ থেকে পাশের বেডে আহতদের খোঁজখবর নিয়েছি। ওইসময় জননেত্রী শেখ হাসিনার সদিচ্ছায় উন্নত চিকিৎসার জন্য আমাকে জার্মানীতে পাঠানো হয়। সেখানে নাগরিকত্ব পেয়েছিলাম। চাইলে স্ত্রী আর একমাত্র সন্তান নিয়ে আরামে জীবন কাটিয়ে দিতে পারতাম। কিন্তু মন সায় দেয়নি।

প্রশ্ন : জার্মানীর নাগরিকত্ব ছেড়ে কেন দেশে আসলেন?

চন্দন শীল : দল, দেশ আর দেশের মানুষের টানে দেশে চলে এসেছিলাম। বিলাসী বা আয়েশী জীবন তখন তুচ্ছ মনে হয়েছিল। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর বিএনপি-জামায়াত চারদলীয় জোটের টার্গেট হয়ে শামীম ওসমান দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন। সেই সময় নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগে দেখা দেয় স্থবিরতা। শামীম সমর্থক ও নেতাকর্মীদের মাঝে নেমে আসে হতাশা। শামীম ওসমানের পরামর্শে ২০০২ সালে কলকাতা চলে আসি। প্রথমে সেখান থেকে বাংলাদেশে মোবাইলের মাধ্যমে নানা দিক নির্দেশনা দিয়ে নেতাকর্মীদের চাঙ্গা করে তোলার চেষ্টা করেছি। কিন্তু এভাবে আর ভালো লাগছিলোনা। ঝুঁকি সত্ত্বেও ২০০৩ সালে সরাসারি বাংলাদেশে চলে আসি, প্রথমে ঢাকায় অবস্থান করি। আমার বাসাটাই হয়ে উঠেছিল আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও শামীম ওসমান সমর্থকদের ঠিকানা। পরে নারায়ণগঞ্জ চলে আসি, স্ক্র্যাচে ভর দিয়ে নারায়ণগঞ্জের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত ছুটে বেড়িয়েছি। ওই সময় আমার সাথে ছায়া সঙ্গী ছিলেন ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি এম সাইফউল্লাহ বাদল ও সাধারণ সম্পাদক এম শওকত আলী।  হাজারো নেতাকর্মীর উদ্দীপনায় আমার কখনওই মনে হয়নি আমার দু’টো পা নেই।  শামীম ওসমানের দেশে ফেরার দাবিতে অনুষ্ঠিত হতে থাকে জনসভা। শামীম ওসমানও বিদেশ থেকে মোবাইল ফোনে কখনো জ¦ালাময়ী কখনো আবেগঘন ভাষণ দিয়ে নেতাকর্মীদের উৎফুল্ল করে তুলতেন। সেই আন্দোলন সংগ্রামের সুফল হিসেবেই ২০০৬ সালেল ২৬ ডিসেম্বর দেশে ফিরে স্মরণকালের বৃহত্তম জনসভায় ভাষণ দেন শামীম ওসমান। সেদিন রাতে শামীম ওসমানকে যখন গ্রেপ্তার করতে উদ্যত হয় গোয়েন্দা পুলিশ, বিষয়টি আঁচ করতে পেরে আমি মোবাইলে মোবাইলে নেতাকর্মীদের জানিয়ে দেই। মুহূর্তেই নগরীর চাষাঢ়া হয়ে উঠেছিল হাজার হাজার নেতাকর্মীর বিক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দু। যে কারণে শামীম ওসমানকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়নি তৎকালিন প্রশাসন।

প্রশ্ন : নিজ দল ক্ষমতায় অনেক বছর। এখন কি করছেন?

চন্দন শীল : সংসার, নিজের চাকরি, স্কুল সামলিয়েও সময় দিচ্ছি রাজনীতিতে। এখনও দলের জন্য চষে বেড়াই এ প্রান্ত ওপ্রান্ত। সময় সুযোগ পেলে গান গাইতেও ভুলিনা। গেয়ে উঠি মাগো ভাবনা কেন, আমরা তোমার শান্তি প্রিয় শান্ত ছেলে, তবুও শত্রু এলে অস্ত্র হাতে ধরতে জানি, তোমার ভয় নেই মা, আমরা প্রতিবাদ করতে জানি। পঙ্গুত্ব আমাকে কখনওই হার মানাতে পারেনি। এখন আমি মহানগর আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি। একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি নারায়ণগঞ্জ জেলার সভাপতি। ঐতিহ্যবাহী নারায়ণগঞ্জ হাইস্কুলের ম্যানেজিং কমিটির চেয়ারম্যানের দ্বায়িত্ব পালন করছি।

প্রশ্ন : চাওয়া পাওয়ার হিসেব কি মিলেছে?

চন্দন শীল:- আমরা যারা ৭৫ পরবর্তী সময়ে রাজনীতি এসেছি তারা নিতে নয়, দিতে এসেছিলাম। আমার চাওয়া ছিল বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচার হোক। জননেত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতায় বসছেন। দেশকে সোনার বাংলায় রুপ পেতে দেখবো। এর বেশী আর পাওয়ার কি আছে? হাজার হাজার কর্মীরা ভালোবাসেন, শ্রদ্ধা করেন। জননেত্রী শেখ হাসিনা আমাকে চন্দন বলে স্নেহ করেন, আমার মত ‘দলকানা’র এরচেয়ে বেশী কি চাওয়ার থাকতে পারে।

Islams Group
Islam's Group