News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা সোমবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০২৩, ১৬ মাঘ ১৪২৯

১৫ কোটি লিটার বর্জ্য শীতলক্ষ্যায়


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট প্রকাশিত: জানুয়ারি ২৩, ২০২৩, ১০:২৯ পিএম ১৫ কোটি লিটার বর্জ্য শীতলক্ষ্যায়

শীতে অনেকটাই বিবর্ণ হয়ে গেছে শীতলক্ষ্যার পানি। পরিবেশ অধিদফতরের হিসেব অনুযায়ী, প্রতিদিন  নরসিংদী, গাজীপুর, রূপগঞ্জ ও ঢাকার একাংশের শুধু অপরিশোধিত ১৫ কোটি লিটার শিল্পবর্জ্য বিভিন্ন খাল-বিল দিয়ে এসে শীতলক্ষ্যায় পড়ছে। এছাড়া সিটি করপোরেশনের পয়ঃনিষ্কাশন ও গৃহস্থালী বর্জ্য, পলিথিন, বাজারের উচ্ছিষ্ট অংশ, হোটেল রেস্তোরাঁর বর্জ্যসহ আরও কয়েক কোটি লিটার বর্জ্য এসে মিশছে শীতলক্ষ্যায়। কুচকুচে কালো আর উৎকট দুর্গন্ধের পানি ব্যবহার তো দূরের কথা, নদী পথে চলাচলই এখন দুরূহ হয়ে উঠেছে।

শিল্পবর্জ্যরে প্রভাবে পানিতে অক্সিজেন এর পরিমাণ কমে যাচ্ছে। শীতলক্ষ্যা নদীতে লিটার প্রতি ডিও মেনাস ডিজলভ অক্সিজেন থাকার কথা ৪-৬ মিলিগ্রাম। কিন্তু বর্তমানে আছে মাত্র ১-২ মিলিগ্রাম। নদীর পানিতে অক্সিজেন বেশি মাত্রায় কমে যাওয়ায় মাছসহ জলজ প্রাণী টিকতে পারছে না। স্বচ্ছ পানি কালচে রঙ ধারণ করেছে। সঙ্গে আছে দুর্গন্ধ। পাগলা, নয়ামাটি, সিদ্ধিরগঞ্জের গোদনাইল, শিমরাইল,  ডেমরা, কোনাপাড়া, রূপগঞ্জ, কাচঁপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় চার হাজারের বেশি শিল্প প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব শিল্প প্রতিষ্ঠানে উৎপাদিত ডাইং, কেমিক্যাল বর্জ্যসহ পলিথিন এবং পয়ঃনিষ্কাশন বর্জ্যসহ বিভিন্ন মাধ্যমে নদীতে এসে পড়ে।

এছাড়া খাল বিল, ক্যানেল ও ড্রেনের মধ্যে ময়লা আবর্জনা এসে পড়দে এ নদীতে। কুচকুচে কালো আর উৎকট দুর্গন্ধের পানি ব্যবহার তো দূরের কথা, নদী পথে চলাচলই এখন দুরূহ হয়ে উঠেছে। নারায়ণগঞ্জের চর সৈয়দপুর থেকে নরসিংদীর পলাশ পর্যন্ত কমপক্ষে অর্ধশতাধিক নালা, ড্রেন ও খাল দিয়ে এসে পড়া শিল্প বর্জ্য, পয়ঃনিষ্কাশন বর্জ্যসহ নানা বর্জ্যের কারণে শীতলক্ষ্যা রূপ হারিয়েছে। বর্জ্যের কারণে শুধু শীতলক্ষ্যাই নয়, নারায়ণগঞ্জের সব খাল-বিল ও নালার পানিও দূষিত হয়ে উঠেছে। পরিবেশ অধিদফতরের হিসেব অনুযায়ী, প্রতিদিন শুধু অপরিশোধিত ১৫ কোটি লিটার শিল্প বর্জ্য বিভিন্ন খাল-বিল দিয়ে এসে শীতলক্ষ্যায় পড়ছে।

এছাড়া সিটি করপোরেশনের পয়ঃনিষ্কাশন ও গৃহস্থালী বর্জ্য, পলিথিন, বাজারের উচ্ছিষ্ট অংশ, হোটেল রেস্তোরাঁর বর্জ্যসহ আরও কয়েক কোটি লিটার বর্জ্য এসে মিশে শীতলক্ষ্যায়। পরিবেশ অধিদফতরের হিসাব অনুযায়ী, শুধু নারায়ণগঞ্জ অংশে তরল বর্জ্য নির্গমনকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে ৩১৮টি। প্রতিটি শিল্প প্রতিষ্ঠানেই পরিশোধন প্রকল্প ইটিপি প্ল্যান্ট রয়েছে। কিন্তু উৎপাদন খরচ না বাড়াতে ইটিপি প্ল্যান্ট চালানো হয় না বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানে। যে কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোর অপরিশোধিত বর্জ্যে দিন দিন নদীর পানির রঙ কালচে হয়ে পড়ছে।

জানাগেছে, গোদনাইল ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টের প্রধান কাজ হচ্ছে টারবিডিটি অর্থাৎ পানির ঘোলাটেভাব ও জিইনফেকশন অর্থাৎ জীবাণু দূরীকরণ করা। এ দু’টি কাজ এই প্লান্টে সফলভাবেই সম্পন্ন হচ্ছে। নদী থেকে পানি প্লান্টে আসার পর কয়েক ধাপে পানি বিশুদ্ধকরণ করা হয়। কোয়াগুয়েশন, ফ্লুকুলেশন, সেনিমেন্টেশন ও ফিলট্রেশন। প্রথমে কোয়াগুয়েশন এর সময়েই প্রি-ক্লোরিনেশন এবং শেষ পর্যায়ে ফিলট্রেশন এর সময় পোস্ট ক্লোরিনেশন করা হয়। কিন্তু শীতলক্ষ্যা নদীর পানিতে চার ধরনের কেমিক্যাল উপাদান মিলে। সেগুলো দূর করা সম্ভব হয় না।

ডাইংবর্জ্য মিশ্রিত নদীর পানিতে সচরাচর ম্যাঙ্গানিজ, আয়রন, সালফার ও এমোনিয়া থাকে। ম্যাঙ্গানিজ ও আয়রনের কারণে পানির রং কিছুটা লালচে ধরনের হয়। সালফার ও এমোনিয়ার জন্য পানিতে দূর্গন্ধ হয়। এই ক্ষতিটা হচ্ছে ডাইং এর বর্জ্যরে জন্য। আপাতত আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী শীতলক্ষ্যার পানি সংশোধিত করা হচ্ছে। কিন্তু গোদনাইল ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট এর ল্যাব থেকে নিয়মিত শীতলক্ষ্যার পানি দূষণের মাত্রা সম্বলিত প্রতিবেদন দেয়া হয় না। ফলে ল্যাব এর মূল্যবান যন্ত্রপাতি অকেজো হওয়ার পথে।

নারায়ণগঞ্জ শিল্প এলাকা সেহেতু মাইগ্রেণ বা বহিরাগত লোক সংখ্যা বেশি। এ জন্য পানির জন্য হাহাকার  তৈরী হয় গরমকালে। শীতকালে বাড়ে শীতলক্ষ্যার নদীর দূষণের মাত্রা। পানি গাঢ় কালচে রং ধারণ করে। ওয়াসার কাছে নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীর পানির প্রধান শত্রু ডাইং কারখানা। একমাত্র ডাইং এর কারণে পানি বেশি করে দূষিত হচ্ছে। গোদনাইল ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট নিয়মিত পানি দূষণমুক্ত করলেও পানির রং ও গন্ধ দূর করতে পারছে না। শীতকালেই পানির রং ও কটু গন্ধ বেশি করে টের পাওয়া যায়। দু বছর ধরে নারায়ণগঞ্জে শীতলক্ষ্যার পানির দূষণের মাত্রার নিয়মিত তথ্য দিতে পারছে না গোদনাইল ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট। এই ট্রিটমেন্ট প্লান্টের ল্যাবের দামী দামী মেশিনগুলি অকেজো হওয়ার পথে। ল্যাব এর মেশিনগুলো নিয়মিত পরিচর্যা করা হয় না বলে অভিযোগটি পুরনো।

এদিকে, ওয়াসার নতুন কোন খবর নেই। এডিবি’র বড় প্রকল্পের এখনো কুল কিনারা হয়নি। একের পর এক টেকনিক্যাল মিটিং চলছে নাসিক এর সাথে। টেন্ডার প্রক্রিয়া এগোচ্ছে না। ওয়াসা’র পরিকল্পনা কিছু কাঁটছাট করা হচ্ছে। সমস্যা অর্থনৈতিক সংকট। যতটুকু না হলেই নয় ততটুকুই উন্নয়ন পরিকল্পনায় রাখা হচ্ছে। সিদ্ধিরগঞ্জে ওয়াসার  নেটওয়ার্কিং (নতুন পাইপ লাইন)  পরিকল্পনা থেকে বাদ পড়তে যাচ্ছে। যুক্ত হচ্ছে শীতলক্ষ্যা নদীর পূর্বপাড়ে ওয়াকওয়ে ও পার্ক নির্মাণ পরিকল্পনা।

এদিকে, নারায়ণগঞ্জ মহানগরী (সিদ্ধিরগঞ্জ বাদে) এলাকায় নতুন নেটওয়ার্কিং করার ফলে মহানগরবাসী সবচেয়ে বেশি বিশুদ্ধ পানি পাবেন। এডিবি’র প্রকল্প বাস্তবায়নে চায়নীজ কোম্পানী পানীয় জলের বিশুদ্ধতাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। নতুন নেটওয়ার্কের সাথে কোম্পানীটি গোদনাইল ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টকে পুরোপুরি সংস্কার করে দিবে। সে সাথে এই পানি শোধনাগারের উৎপাদন ক্যাপাসিটিও দ্বিগুন বাড়াবে। বর্তমানে গোদনাইল পানি শোধনাগারে দৈনিক ২ কোটি ৩০ লাখ লিটার পানি শোধন করে সরবারহ করা হয়। এই ক্যাপাসিটি দৈনিক ৪ কোটি ৫০ লাখ লিটারে উন্নীত করা হবে। এবং শুস্ক মৌসুমে ওয়াসার পানিতে শীতলক্ষ্যার ময়লার দুর্গন্ধ থাকবে না।

 নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকায় ওয়াসার নেটওয়ার্ক নেই। ১ থেকে ৫নং ওয়ার্ডে ওয়াসার নেটওয়ার্ক না থাকায় সেখানকার বাসিন্দারা ডীপ টিউবওয়েল বসিয়ে পানি সংগ্রহ করে। ভবিষ্যতে পরিবেশ বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেতে ওয়াসা ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমানোর লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে ওয়াসা। ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগের পানির উপর বেশি জোর দিতে বলা হচ্ছে। বিশেষ করে নদী-নালা, খালবিল, পুকুর-জলাশয়ের পানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকায় ডিপটিউবওয়েল এর উপর নির্ভরশীলতা কমাতেই ওয়াসার নেটওয়ার্ক তৈরীর পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। তাছাড়া এলাকাবাসীও ওয়াসার গ্রাহক হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। অনেক এলাকায় বিশুদ্ধ পানির সংকট চরমে। দিনে দিনে ১ থেকে ৫ নং ওয়ার্ড এলাকায় বিশুদ্ধ পানির চাহিদা বাড়ছে।

Islams Group
Islam's Group