News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা সোমবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০২৩, ১৬ মাঘ ১৪২৯

যেভাবে কাটছে আদমজী বিহারিদের জীবন


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | ফারজানা মিতু : প্রকাশিত: জানুয়ারি ১৭, ২০২৩, ১২:২৬ এএম যেভাবে কাটছে আদমজী বিহারিদের জীবন

অনেক আগে থেকেই বাংলাদেশে বিহারি জাতিগোষ্ঠী ছিল। ব্রিটিশ আমলে তাদের আনুকূল্যে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের কাছে সৈয়দপুরে রেল কোম্পানিতে যোগদান করতে প্রায় সাত হাজার অধিবাসী বিহার থেকে আসে। এরপর ১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে দেশ ভাগ হলে এদেশ থেকে বিপুল সংখ্যক হিন্দু ভারতে চলে যায়, প্রায় সমসংখ্যক মুসলমান পাকিস্তানে চলে আসে।

পাকিস্তানের এক অংশের নাম ছিল পূর্ব পাকিস্তান যেখানে বাংলাভাষীরা থাকত। আর এক অংশে উর্দুভাষীরা থাকতো সে অংশের নাম ছিল পশ্চিম পাকিস্তান। কর্মসংস্থানের কারণে উপমহাদেশের মানুষেরা ছড়িয়ে পড়েছিল ভারত ও পাকিস্তানে। যেসব বিহারের জনগণ কাজের প্রয়োজনে পূর্ব বাংলায় এসেছিল। ১৯৫১ সালে তাদের পাকিস্তানে নাগরিকত্ব দেওয়া হয় কিন্তু তাঁরা ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানের পক্ষে থাকায় বাংলাদেশে স্বাধীন হওয়ার পর বিহারিদের নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। যদিও স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে জন্ম নেওয়া বিহারিদেরও ফেলা হয় একই কাতারে এবং শিকার হতে হয় বঞ্চনার। দেশের বড় বড় পেশায় তাদের অবস্থান খুব একটা চোখে পড়ে না নাগরিক সুবিধা থেকেও তাঁরা হচ্ছেন বঞ্চিত।

সরকারি তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে ১৩টি জেলার ১১৬টি ক্যাম্পে এরা বাস করেন। নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের আদমজী বিহারি তন্মধ্যে ক্যাম্প (শিবির) হচ্ছে অন্যতম। এ ক্যাম্পটি প্রায় ৩৭ একর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত যেখানে ২৪০০ পরিবারের প্রায় ১৩ হাজার বিহারি বসবাস করেন। বিহারিদের প্রায় সবাই জন্ম থেকে এখানে বসবাস করে আসছেন। বিহারিদের আছে বাংলাদেশী পরিচয়পত্র, সুযোগ পাচ্ছেন ভোটদানসহ বাহিরে চাকরি-বাণিজ্য করার কিন্তু নাগরিক সব সুযোগ সুবিধা থেকে তাঁরা আজও বঞ্চিত।

আদমজী বিহারি ক্যাম্পে গেলে চোখে পড়বে বাংলাদেশ ভূখ-ে পাকিস্তানের পতাকা উড়বার দৃশ্য। বাংলাদেশের দীর্ঘ সময় বসবাস করেও তাঁরা যেমন এখনো বাংলার সাথে উর্দুভাষী তেমন তাঁরা পালন করে যাচ্ছেন নিজস্ব যতসব সংস্কৃতি আর ঐতিহ্য।

ক্যাম্পে প্রবেশ করলেই চোখে পড়বে সরু রাস্তাঘাট, গণগোসলখানা ও রান্নাঘর। জীবন ধারাকে সামান্য উন্নত করতে বিহারিরা নিজেদের ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনা শেখানোর দিকে নজর দিচ্ছেন কিন্তু টাকার অভাবে দশম শ্রেণি পর্যন্ত থামতে হচ্ছে পড়াশোনা। বিহারিদের বেশিরভাগই দোকানদার, কসাই, রিকশা চালক, নরসুন্দর, রাজমিস্ত্রি, দিনমজুর। এছাড়াও ক্যাম্পে গেলে চোখে পড়বে গলিতে গলিতে পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও বিক্রি করছেন নানা রকম সবজি, কেউবা খাবারের পসরা নিয়ে এলাকার মোড়ে বসেছেন এবং ক্রেতার তালিকায় সিংহভাগই নারীদের দখলে। এদিকে বিকেল হলেই চোখে পড়বে সারি সারি পিঠার দোকান এবং বিক্রেতার আসনে নারীরা।

সিদ্ধিরগঞ্জের বিহারি ক্যাম্পে দীর্ঘ সময় অবস্থানের সুযোগ হয়েছিল। রাবেয়া বেগম নামের এক নারী বিক্রেতার সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, ‘আমার দুই ছেলে আছে তাদেরকে টাকার অভাবে পড়ালেখা করাতে পারিনি। গার্মেন্টসে কাজ করে এখন তাঁরা বিয়ে করে আলাদা থাকে। আমার স্বামী ছয় হাজার টাকা বেতনে চাকরি করে তা দিয়ে সংসার চলে না। তাই সবজি বিক্রি করি সংসার চালাই।

ক্যাম্পের অলিতে গলিতে চোখে পড়বে বিভিন্ন গবাদি পশু। বিহারিরা এই স্বল্প জায়গার মধ্যে যতটুকু সম্ভব নিজের মতো করে আর্থিকভাবে সচ্ছল হওয়ার চেষ্টা করছেন। এ কারণেই পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও সংসারের উপার্জনে অংশ নিতে বিভিন্ন কারুপণ্যের কাজ করে থাকেন।

এই ক্যাম্পে বসবাস করা ঋতু নামের এক নারী জানান, তার জন্ম এই বিহারি ক্যাম্পেই। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন তিনি। সরকারি সহায়তা না থাকায় পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। প্রায় ছয় বছর পূর্বে তার বিয়ে হয়েছে। বিয়ের আগ পর্যন্ত অন্যের বাসায় কাজ করা হতো তার। বিয়ের পর বিভিন্ন সূচিশিল্পের আগ্রহ থাকায় শাড়ি, লেহেঙ্গা, থ্রি-পিস এর কাপড়ে পুঁথি-সুতার বাহারি ডিজাইনের নকশা বসাতেন। কিন্তু এখন প্রযুক্তির ব্যবহারে কম সময়ে বেশি পণ্য উৎপাদিত হওয়ায় হাতের কাজের পারিশ্রমিক কমে গিয়েছে। আগে যেখানে একটি ব্যাগের সূচিকর্মের জন্য ২০০ টাকা পেতেন এখন সেখানে ১১০ টাকা পাচ্ছেন। পারিশ্রমিক কম থাকার পরেও সূচিকর্মের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন কারণ তার স্বামী সেলুনের কাজ করেন। যা দিয়ে পরিবারের সচ্ছলতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয় না।

ঋতুর মতন এমন আরও শত পরিবার আছেন যেখানে তাদের কষ্ট করে জীবনযুদ্ধে টিকিয়ে রাখতে হচ্ছে নিজেদের।

আরো এক নারীর সাথে কথা বলে জানা যায় তার নাম খাদিজা বেগম (৩৫)। জন্মের পর থেকেই এই ক্যাম্পে তার বসবাস। এখানেই বিয়ে হয় তার। তার স্বামী দিনমজুরের কাজ করেন। ঘরে রয়েছে দুটি সন্তান। তাদেরকে ১০ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করিয়েছেন। বর্তমানে তার ছেলেরা গার্মেন্টসে কাজ করে। এভাবেই চলছে তাদের সংসার।

বিহারি ক্যাম্পের গল্পগুলো অসচ্ছলতার। উচ্চ শিক্ষার আলো এখনো ঠিকমতো তাদের ঘরে পৌঁছায়নি। ক্যাম্পে প্রবেশ করলেই কানে বাঁধবে নানান সুবিধা বঞ্চিত গল্পগুলো। ক্যাম্পের মানুষগুলোর চাওয়া তাঁরাও বাংলাদেশি। নিজেদেরকে এই দেশের নাগরিক হিসেবেই তাঁরা মনে করেন। তাঁরা বাংলাদেশী বিরোধী নন। তাঁরা নিজেরা দক্ষ হতে চান, অসচ্ছলতা কাটাতে চান, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যাতে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারেন সেটি চান। যেহেতু তাঁরা জাতীয় পরিচয়পত্র পেয়েছেন, লিখিতভাবে নাগরিক স্বীকৃত পেয়েছেন, নাগরিক সব অধিকারটুকুও তাঁরা পেতে চান।

আদমজী বিহারি ক্যাম্পের চেয়ারম্যান লিয়াকত হোসেন জানান, তাদের ক্যাম্পের অধিকাংশ বিহারি সেলুন ও গার্মেন্টসে কাজ করেন। পাশাপাশি অনেকে আবার দিনমজুর, অনেকেই আবার সূচিকর্মের সঙ্গে যুক্ত। এই ক্যাম্পটি সরকারি জায়গায় হওয়ায় আমাদের কোনো বাসাভাড়া দেওয়া লাগে না। সরকার থেকে বিদ্যুৎ বিলও ফ্রি করে দেওয়া হয়েছে। তবে সুপেয় পানির সমস্যা ছিল। কিন্তু কাউন্সিলরের সহায়তা বিভিন্ন স্থানে কয়েকটি সাবমারসিবল পাম্প বসানোর ফলে এই সমস্যাটি এখন নেই। আমাদের ক্যাম্পে উম্মুল ক্বোরা নামের একটি স্কুল আছে এই স্কুলটির কারণে প্রত্যেক ঘরে ঘরে শিক্ষার আলো পৌঁছে গেছে।

Islams Group
Islam's Group