News Narayanganj
Bongosoft Ltd.
ঢাকা মঙ্গলবার, ০৬ ডিসেম্বর, ২০২২, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে গার্মেন্টস মালিক শ্রমিক


দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট প্রকাশিত: নভেম্বর ৩, ২০২২, ০৮:২৬ পিএম অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে গার্মেন্টস মালিক শ্রমিক

‘সারাদিন কারখানায় গ্যাসের চাপ থাকে না। কারেন্ট চলে গেলে মেশিনের ভেতর কাপড়গুলো নষ্ট হয়ে যায়। বারবার জেনারেটর চালু করে কাজ করতে হয়। আমরাই বুঝি কারখানার অবস্থা ভালো না। যদিও মালিক এখনও আমাদের কিছু বলে নাই, টাইমমত বেতন দিতাছে। কিন্তু যখন নিজেই বুঝতাছি আমার কাজ কমতাছে, তখন চাকরি হারানোর টেনশন তো থাকেই। মালিকের আয় না হইলে আমাগো দিব কইথিকা?’

কথাগুলো বলছিলেন নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার ইউরোটেক্স নিটিং নীটওয়্যারের ডাইং সেকশনের শ্রমিক সোহাগ। কল-কারখানায় গ্যাস বিদ্যুৎ সংকটের কারণে মালিকদের যেই দৌঁড়ঝাপ শুরু হয়েছে সেটা ভালোভাবেই বুঝতে পারছেন শ্রমিকরা। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো শ্রমিক ছাঁটাই শুরু না করলেও, ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোতে চলছে শ্রমিক ছাঁটাই। দেশের বৃহৎ কর্ম সংস্থানের অন্যতম মাধ্যম পোশাক কারখানার এমন চিত্র মালিক শ্রমিক উভয়ের জন্যেই আশঙ্কাজনক বলে মন্তব্য করছেন বিকেএমইএ’র নেতারা।

নারায়ণগঞ্জে পোশাক উৎপাদন ও রপ্তানির সাথে জড়িত কারখানা রয়েছে প্রায় সাড়ে তিন হাজার। এর মধ্যে কল-কারখানা অধিদপ্তরে নিবন্ধিত রয়েছে ২ হাজার ২০০টি। প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষ তাদের আয় রোজগারে কারখানার উপর নির্ভরশীল। এসব কারখানার মধ্যে কোনটি স্থানীয় আবার কোনটি বৈদেশিক বাণিজ্যের সাথে জড়িত। বিকেএমইএ’র তথ্য অনুযায়ী ছোট বড় সকল প্রতিষ্ঠানগুলো গত ৩ মাস ধরে টানা বাড়তি খরচের মুখে পড়েছে। এর পেছনে রয়েছে বিদ্যুতের লোডশেডিং, গ্যাসের চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ না থাকা এবং জ্বালানির বাড়তি খরচ।

পোশাক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, এতদিন কারখানাগুলোতে গ্যাসের চাপ না থাকা নিয়ে অভিযোগ ছিল। বিদ্যুৎ বিভ্রাট শুরু হয়ে যাবার পর সেই পাইপলাইন গ্যাসের কথা ভুলে এবার উল্টো এলএনজি ব্যবহার করে নিজেদের রক্ষা করতে চাইছেন কারখানা মালিকরা। কারণ ডিজেলের চাইতে গ্যাসের খরচ তুলনামূলক কম। বাজারে পর্যাপ্ত গ্যাস না থাকায় ডিজেল কিনে উৎপাদন অব্যাহত রাখতে হচ্ছে। উৎপাদন থেকে বিপণন পর্যন্ত খরচ এতটাই বেড়ে যাচ্ছে যা সামাল দেয়া দিন দিন কঠিন হয়ে পড়েছে। আগামী তিন মাস যদি এর ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকে তাহলে ছোট ও মাঝারি আকারের কারখানাগুলো বসে যাবে। একই সাথে বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের কাজের পরিসর ছোট করতে বাধ্য হবে।

সরেজমিনে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় ইউরোটেক্স নীটওয়্যার এবং আইএফএস টেক্সওয়্যার ঘুরে দেখা যায়, সুইং, নীটিং, প্যাকেজিং, ডাইং সহ বেশ কয়েকটি সেকশনের একাধিক লাইন বন্ধ হয়ে গেছে। বন্ধ করে রাখা মেশিনগুলো কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে।

ইউরোটেক্স কারখানার শ্রমিকরা বলছেন, মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে সুইং সেকশনের লাইন ১২৫ থেকে নেমে ৮৫ তে এসে ঠেকেছে। যেসকল শ্রমিকরা কাজ ছেড়ে চলে যাচ্ছেন, তাদের স্থান পূরণেও নতুন লোক নিচ্ছে না প্রতিষ্ঠান। এছাড়া ডাইং সেকশনে গ্যাসের অভাবে মেশিন বন্ধ করে রাখা, প্যাকেজিং সেকশনে পর্যাপ্ত কাজ না থাকাসহ বিভিন্ন সমস্যার মুখে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

একই চিত্র ছিল আইএফএস টেক্সওয়্যার এ। প্রায় ২২ টন ধারণক্ষম ডাইং এ বর্তমানে কাজ চলছে সাত থেকে আট টন কাপড়ের। সেটুকুও নির্ভর হয়ে পড়েছে ডিজেলের উপর। বাজারে এলএনজি সংকট চলায় বাধ্য হয়ে বাড়তি দামের জ্বালানি ব্যবহার করতে হচ্ছে তাদের। প্রতিদিন অন্তত ২ লাখ টাকার কেবল ডিজেলই কিনতে হচ্ছে প্রতিষ্ঠান চালু রাখার জন্য। এছাড়া অন্যান্য আনুসাঙ্গিক মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে বাড়তি খরচ তো আছেই। কারখানার ভেতরের নীটিং সেকশনে কাজ নেই বললেই চলে। কেবলমাত্র গার্মেন্টস সেকশন চালু রেখে কাজ চালিয়ে নেয়া হচ্ছে। শ্রমিকরা নিয়মিত হাজিরা দিয়ে বেতন পাচ্ছেন কারখানা থেকে। গত তিন মাস ধরে এমন পরিস্থিতি চললেও এভাবে কতদিন ধরে রাখতে পারবেন মালিকপক্ষ তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছে শ্রমিকরা।

প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিস্থিতি জানতে চাইলে ইউরোটেক্স টেক্সওয়্যারের সিও শামীম ইসলাম বলেন, আমাদের গ্যাসের যেই প্রেশার সেটা সবসময় ৫০ শতাংশের কম থাকে, মাঝে মাঝে সেটা ২০ শতাংশে এসে ঠেকে। এর ফলে আমাদের ডাইং সেকশন চালিয়ে রাখার জন্য প্রতিদিন ১০ থেকে ১১ লাখ টাকার ডিজেল কিনতে হচ্ছে। ফলে একই সাথে আমার গ্যাসের বিল এবং ডিজেলের বিল দুটোই চালিয়ে নিতে হচ্ছে। যেটা আমাদের জন্য বাড়তি খরচ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর পাশাপাশি আমাদের বিপুল পরিমাণ শ্রমিককে বেকার বসিয়ে রাখতে হচ্ছে। আমাদের উৎপাদন নেই, কিন্তু পেমেন্ট করতে হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, আমাদের কারখানা তিনটি ইউনিটে চলে। নীট, ওভেন ও সোয়েটার। বর্তমানে সোয়েটার অর্ডার প্রায় বন্ধ সারাদেশে। অর্ডার পেলে কাজ চলে নাহলে চলে না। ওভেনের মধ্যে ডেনিমের অর্ডার কমেছে ৪০ শতাংশ। নন ডেনিমেও প্রায় ৩০ শতাংশ অর্ডার কমেছে ইউরোপে। তার উপর বৃহৎ বায়ার এইচ এন্ড এম এবং এলপিপি বলছে পণ্য পরে নিব। ফলে আমাদের অর্ডার দেয়া পণ্য প্রস্তুত, কিন্তু সেগুলো শিপমেন্ট হচ্ছে না এবং আমরা টাকা উঠাতে পারছি না। অনেক ফ্যাক্টরি এদের কাজ করতে গিয়ে পুরোটাই বসে গেছে। এর পাশাপাশি নীট সেকশনে প্রতিবছর শীত মৌসুমে চাহিদা কমে যায়। তাছাড়া এগুলো অনেক কম মূল্যের পণ্য। ফলে সবদিক থেকেই আমরা বিপদে পড়েছি।

একই বিষয়ে আইএফএস টেক্সওয়্যার এর জেনারেল ম্যানেজার মোতাহার হোসেন ভুইয়া বলেন, আমাদের অনেক সেকশন আছে যেগুলো সম্পূর্ণ বিদ্যুৎ এর উপর নির্ভরশীল। দিনে প্রায় ৬/৭ ঘন্টা কারেন্ট না থাকায় সেই সেকশন বন্ধ থাকে। অন্যান্য সেকশন কোনরকমে চালিয়ে রাখতে প্রায় ২ লাখ টাকার ডিজেল কিনতে হয় দৈনিক। প্রতি মাসে অন্তত ৪০ লাখ টাকা কেবল এক্সট্রা পাওয়ারে খরচ বেড়েছে। এছাড়া ছয় মাসে যেই পরিমান এক্সপোর্ট করা হয়েছে তার ত্রিশ ভাগ অর্ডার আছে এখন। প্রায় ৭০ ভাগ অর্ডার কমে গেছে। তার উপর এতসব খরচ। এখন আমরা নতুন করে অর্ডার নিতেও ভয় পাচ্ছি। কারণ একদিকে আমাদের বাড়তি খরচ এবং অন্যদিকে বায়ার পণ্য নিতে গড়িমসি করার ভয়। মোট কথা অর্ডার কমেছে, জ্বালানি খরচ বেড়েছে আবার অর্ডারের কাজ শেষ করার পর ঠিকভাবে পেমেন্টও মিলছে না। এটা চলতে থাকলে পুরো ব্যবসাই বসে যাবে।

এই বিষয়ে বিকেএমইএ'র এক্সিকিউটিভ প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ হাতেম বলেন, আমাদের ম্যাক্সিমাম শ্রমিকরা পিস রেটে কাজ করে। কারণ স্যালারির চাইতে পিস রেটে আয় বেশি হয়। এখন যেহেতু কাজ নেই, তাই নো ওয়ার্ক নো মানি অবস্থা। এরপরেও মিনিমাম স্যালারি দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে। একদিকে ইনকাম কম হচ্ছে, তার উপর মাসিক বেতন ঠিকভাবে পাবে না। কারণ মালিক ঠিকমত শিপমেন্ট করতে পারছে না। অনেক পণ্য রেডি কিন্তু বায়ার নিচ্ছে না। তারা বলছে ২ মাস পরে পাঠাও। টাকা আটকে আছে। অনেকে পণ্য নিলেও ৬ মাস পরে পেমেন্ট দিবে। আমাদের ব্যাংকের ইন্সটলমেন্ট আটকে আছে। আমাদের বিদ্যুৎ গ্যাসের কারণে ডিজেলের খরচ বেড়েছে। আগে যেই গ্যাস খরচ হতো ১৬ টাকা ইউনিট, সেটা সিএনজি থেকে কিনতে হচ্ছে ৪২ টাকা ইউনিট। টোটাল গার্মেন্টস সেক্টর এখন বিপদের মুখে।

তিনি আরও বলেন, আমাদের ডাইং বন্ধ হওয়ার উপক্রম হওয়ায় পর্যাপ্ত ফ্যাব্রিক দিতে পারছে না। ফলে ফ্যাব্রিক আমদানি করতে হচ্ছে বিদেশ থেকে। আমাদের একটি পণ্য রপ্তানি করে ১০০ ডলার পেলে ৭০ ডলার আমদানিতে খরচ হতো। এখন বাকি ৩০ ডলারও আবার আমদানিতে খরচ হচ্ছে। এমন অবস্থায় আমরা দাবি তুলেছি, রিজার্ভ থেকে টাকা নিয়ে আমাদের গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা হোক। আমরা পণ্য রপ্তানি করে দ্বিগুণ পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভে ফিরিয়ে দিব। তা না হলে গার্মেন্টস সেক্টরে উপার্যিত বৈদেশিক মুদ্রা খরচ হয়ে যাবে এবং পরিস্থিতির উন্নতি না ঘটলে অনেক কারখানা বসে যাবে।

Islams Group
Islam's Group